রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের জমি দখল: সচিবের দেওয়া অভিযোগপত্র ‘নিখোঁজ, দায় সারছে প্রশাসন তালায় পাষন্ড স্বামীর বি রু দ্ধে স্ত্রী হ ত্যা র অ ভি যো গ! সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সভায় জেলার উন্নয়নে ২১ দফা দাবি কালিগঞ্জে কাটা তাল গাছের মাথার আ ঘা তে কৃষকের মৃ ত্যু সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ২৫টি ফাঁ দ উ দ্ধা র সখিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টূর্ণামেন্টের ফাইনাল আশাশুনিতে পাউবো’র বেড়িবাঁধে ভাঙন, মেরামতে কাজ চলছে দ্রুতগতিতে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৪৭ তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের উদ্বোধন সাতক্ষীরার আশাশুনিতে বিএনপি নেতাকে কু পি য়ে ও পি টি য়ে জ খ ম সুন্দরবনের কাচিকাটায় নৌকা ডুবি, নিখোঁজ ৮, উদ্ধার ৫ এখনো নিখোঁজ-৩

জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী: জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ শুরু ৭ এপ্রিল

✍️এস এম শহিদুল ইসলাম📝 জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক✅
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০৩ বার পড়া হয়েছে

“মাছরাঙা পাখির মতো ছোঁ মেরে জাটকা ধরলে কয়েক বছর পর থালায় ইলিশ খোঁজা দায় হবে”— সাতক্ষীরার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক সৌহার্দ্য সিরাজের এই আক্ষেপ আজ এক জাতীয় উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি। আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ কেবল একটি রুপালি শস্য নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অমূল্য সম্পদ রক্ষায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬’। ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে পালিত হবে এই বিশেষ সচেতনতামূলক সপ্তাহ, যার এবারের মূল প্রতিপাদ্য: “জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী”।

০৭-১৩ এপ্রিল “জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬” উপলক্ষে মৎস্য অধিদপ্তর/মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় মুঠোফোনে এক ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছে।

​ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। সাগরের লোনা পানিতে বড় হলেও ডিম ছাড়ার জন্য এরা মিঠা পানির নদীতে আসে। ডিম ফুটে বের হওয়া ছোট ছোট ইলিশই হলো ‘জাটকা’। নিয়মানুযায়ী, ২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চির চেয়ে ছোট ইলিশকে জাটকা বলা হয়। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত জাটকা বেড়ে ওঠার প্রধান সময়। এই সময়ে নির্বিচারে জাটকা নিধন করলে পূর্ণাঙ্গ ইলিশের উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি বছর যদি মাত্র ২০ শতাংশ জাটকা রক্ষা করা যায়, তবে দেশে ইলিশের উৎপাদন প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব।

​০৭ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী এই আয়োজনে উপকূলীয় ও নদীবেষ্টিত জেলাগুলোতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবারের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে:

​নদী ও মোহনা এলাকায় কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বিত অভিযান। ​অবৈধ কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালের ব্যবহার বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা। ​জেলে পল্লীগুলোতে সচেতনতামূলক সভা, জারিগান ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন।

​জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ এবং গণমাধ্যমে প্রচার।

​বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। জিডিপিতে এর অবদান ১ শতাংশের বেশি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা এই ইলিশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। গত এক দশকে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপে ইলিশের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫ লাখ মেট্রিক টনের উপরে পৌঁছেছে। জাটকা রক্ষা করা গেলে এই সমৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ইলিশের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকবে।

​জাটকা ধরা নিষিদ্ধ থাকাকালীন জেলেদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সরকার এই সংকট মোকাবিলায় ‘ভিজিএফ’ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের চাল সহায়তা প্রদান করছে। তবে মাঠ পর্যায়ের অনেক জেলের অভিযোগ, এই সহায়তা সব সময় পর্যাপ্ত নয় এবং বিতরণে মাঝেমধ্যে অনিয়ম হয়। সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেদের অভিযোগ, ঋণের কিস্তি এবং সংসার চালানোর চাপে অনেক সময় নিষিদ্ধ সময়েও তারা নদীতে নামতে বাধ্য হন। এই মানবিক দিকটি বিবেচনায় নিয়ে এবারের সংরক্ষণ সপ্তাহে বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহায়তা বৃদ্ধিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

​জাটকা নিধনের প্রধান হাতিয়ার হলো অবৈধ কারেন্ট জাল এবং ঘন ফাঁসের বেহুন্দি জাল। এই জালে অতি ক্ষুদ্র জাটকাও আটকা পড়ে নষ্ট হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনায় এবার এসব জালের উৎপাদন ও বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালানো হতে পারে। এসব জালের কারখানাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নদীতে অভিযান চালিয়ে লাভ নেই, এই প্রাণঘাতী জালের উৎস বন্ধ করতে হবে।

​ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ আজ নানাবিধ পরিবেশগত হুমকির সম্মুখীন। নদীর নাব্য সংকট, চর জেগে ওঠা এবং শিল্পবর্জ্যের কারণে ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশ অনেক সময় মিঠা পানিতে আসার সুযোগ পায় না। এই প্রতিকূলতার মাঝেও জাটকা রক্ষা করা গেলে ইলিশের বংশবিস্তার প্রাকৃতিকভাবেই শক্তিশালী হবে।

​জাটকা সংরক্ষণ কেবল সরকার বা মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সচেতন ক্রেতা হিসেবে আমাদের উচিত ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশ বা জাটকা কেনা থেকে বিরত থাকা। ‘চাহিদা না থাকলে জোগান কমবে’—এই সাধারণ বাজারনীতি ইলিশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে তারা পারিবারিকভাবে জাটকা খাওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।

​মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এক বার্তায় জানিয়েছেন, “আমরা চাই ইলিশ হোক সবার জন্য সহজলভ্য। জাটকা রক্ষা মানেই হলো বড় ইলিশের নিশ্চয়তা।” আগামী ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত পালিত হতে যাওয়া এই সংরক্ষণ সপ্তাহ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আমাদের রুপালি সম্পদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

​সাগর-নদী যদি ইলিশে ভরে ওঠে, তবে তা কেবল বাঙালির রসনাতৃপ্তিই মেটাবে না, বরং সমৃদ্ধ করবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি—জাটকা ধরব না, জাটকা খাব না। সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আজকের জাটকাকে বড় হওয়ার সুযোগ করে দেব। ​মনে রাখতে হবে— জাটকা ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। জাটকা বিক্রয়, পরিবহন ও মজুদ করবেন না। রুপালি ইলিশ আমাদের জাতীয় গর্ব।

সংবাদ টি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2020 All rights reserved
Design by: SHAMIR IT
themesba-lates1749691102
error: Content is protected !!