
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় লবণাক্ততাজনিত সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতিভিত্তিক টেকসই সমাধান হিসেবে ৩১৭টি পরিবারের মধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক বিতরণ শুরু করেছে ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে অভিযোজন ও ব্যবস্থাপনাভিত্তিক উপায়ে দুর্যোগকবলিত অতি দরিদ্র মানুষের সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন ‘স্কেল এলএলএ’ প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চার ধাপে উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ও রমজাননগর ইউনিয়নের নির্বাচিত ৩১৭টি পরিবারের মধ্যে সম্পন্ন হবে। প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে দুই হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি করে পানির ট্যাংক।
এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (২৪ আগস্ট ‘২৬) বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্যাংক বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবিদ হাসান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম, প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও উপকারভোগী পরিবারের সদস্যরা।
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ ও সুপেয় পানির উৎস ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির জন্য স্থানীয় মানুষকে দূরবর্তী উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের, পানি সংগ্রহে অতিরিক্ত সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এ অবস্থায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে কম খরচের, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সমাধান হিসেবে বেছে নিয়েছে ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ। প্রকল্পের আওতায় বিতরণ করা দুই হাজার লিটার ধারণক্ষমতার প্রতিটি ট্যাংক শুষ্ক মৌসুমে একটি পরিবারের পানির চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ সূত্রে জানা যায়, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে একদিকে যেমন সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। ট্যাংক স্থাপনের জন্য পরিবারগুলো নিজেদের উদ্যোগে ভিটি তৈরি ও পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা প্রস্তুত করছে। এর ফলে প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের মধ্যে নিজস্ব মালিকানা, দায়িত্বশীলতা ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া ট্যাংক স্থাপন, ব্যবহার, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে উপকারভোগীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে ট্যাংকগুলোর ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমও মনিটরিং করবেন।
একজন উপকারভোগী বলেন, “বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের এই ব্যবস্থা আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির জন্য অনেক দূরে যেতে হয়। ট্যাংক পাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানির কষ্ট অনেকটাই কমবে এবং পরিবারের নারী ও শিশুদেরও স্বস্তি মিলবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার কারণে ক্রমবর্ধমান সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের এ উদ্যোগ উপকূলীয় মানুষের জন্য একটি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ তৈরি করবে।
উল্লেখ্য, ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ ১৯৯১ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন দুর্যোগপ্রবণ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ত্রাণ সহায়তা, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।