মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
এক জীবনের আলোছায়া-নকিপুরের নোনাজলে শিক্ষক কৃষ্ণানন্দের স্বপ্নযাত্রা কলারোয়ায় বাক প্রতিবন্ধী নারীর বিয়ে ও দুই সন্তানের পি তৃ ত্ব নিয়ে তু মু ল বি ত র্ক পুরাতন সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় মন্দিরে দুঃ সা হ সি ক চু রি! ৪০ দিনে কোন আ লা ম ত উ দ্ধা র হ য় নি  শ্যামনগরের গাবুরাতে পরিবারে আয় বাড়াতে ২৫ জন নারী-পুরুষকে গরু পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ সাতক্ষীরায় প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে মাল্টিস্টেকহোল্ডার সংলাপ দেবহাটায় ২০০ শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ দেবহাটায় শিশুশ্রম প্রতিরোধে আধুনিক ডাটা শেয়ারিং কার্যক্রম   প্রাইম ব্যাংক জাতীয় স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন সাতক্ষীরায় পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগে মাঠ প্রার্থীদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত সাতক্ষীরায় বিস্কুট খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর এক স্কুল ছাত্রীকে ধ র্ষ ণ: আসামী ইব্রাহীমের যা ব জ্জী ব ন স শ্র ম কা রা দ ণ্ড

এক জীবনের আলোছায়া-নকিপুরের নোনাজলে শিক্ষক কৃষ্ণানন্দের স্বপ্নযাত্রা

✍️এস এম শহিদুল ইসলাম📝 জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক✅
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬৩ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনের কোলে নকিপুর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের গেট দিয়ে ঢুকলেই এখন চোখে পড়ে সারি সারি দেবদারু গাছ। বাতাসে দুলছে আম-লিচুর মুকুল, কামরাঙা আর আমলকির ভারে নুয়ে পড়া ডালগুলো যেন এক একটি সফল গল্পের সাক্ষী। তবে এই বাগানের কারিগর আজ আর দাপ্তরিক চেয়ারে নেই। গত ১৫ মার্চ ২০২৪ তারিখে তিনি অবসর নিয়েছেন। কিন্তু ২১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার ডামাডোল যেন আবারও টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে সেই চিরচেনা ব্ল্যাকবোর্ড আর চক-ডাস্টারের ঘ্রাণে।

বিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনি থেমে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের জীবন থেকে শিক্ষা কখনো বিদায় নেয় না। শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ড, পরীক্ষার খাতা, বারান্দায় ছুটে চলা কিশোরীদের হাসি—সব মিলিয়ে যে জীবন, তারই এক নিবেদিত প্রতিচ্ছবি কৃষ্ণানন্দ মুখার্জি।

২০১০ সালের ২৬ জুলাই, নকিপুর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। আর দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর, ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ অবসর নেন। এই সময়টুকু যেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নয়—পুরোটাই ছিল একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে স্বপ্ন বুননের গল্প।

তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের কথা ভাবার অবকাশ ছিল না এক দিনের জন্যও। বিদ্যালয়ের শ্রীবৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, পরীক্ষাকেন্দ্র আধুনিকায়ন—প্রতিটি ধাপে ছিল তাঁর নিরলস পরিশ্রম। এসএসসি ও তৎকালীন জেএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র নতুনভাবে গড়ে তোলার কাজ ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেই কেন্দ্র আজ একটি পরিপূর্ণ কাঠামো—যেখানে ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা।

বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। তাঁর হাত ধরেই নির্মিত হয়েছে পাঁচতলা আধুনিক ভবন। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় এগিয়ে নিতে গড়ে তোলা হয়েছে আইসিটি সমৃদ্ধ পরিবেশ—৭টি স্মার্ট বোর্ড, ২১টি ল্যাপটপ, ৫টি ডেস্কটপ, রোবটিক কর্নার, ব্রডকাস্টিং সিস্টেম, সিসি ক্যামেরা—সব মিলিয়ে এক আধুনিক শিক্ষাঙ্গন।

শুধু পাঠ্যপুস্তকের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই বিদ্যালয়। সংগীত চর্চার জন্য হারমোনিয়াম, তবলা, স্কাউটসের জন্য ড্রামসেট—সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমেও ছিল সমান গুরুত্ব। জাতীয় দিবস কিংবা উপজেলা প্রশাসনের আয়োজিত প্রতিযোগিতায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অর্জন করেছে শ্রেষ্ঠত্ব।

প্রকৃতির ছোঁয়াও যেন জড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কোণে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে লাগানো আম, লিচু, কামরাঙ্গা, আমলকি, সুপারি ও নারিকেল গাছে এখন ফলের সমারোহ। সারি সারি দেবদারু গাছ শোভা বাড়িয়েছে শিক্ষাঙ্গনের। পাকা রাস্তা, সীমানা প্রাচীর ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানটিকে দিয়েছে পূর্ণতা।

এই অর্জনের স্বীকৃতিও এসেছে বারবার। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে ছয়বার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে বিদ্যালয়টি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। কৃষ্ণানন্দ মুখার্জি নিজেও একবার হয়েছেন শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক।

তাঁর কর্মজীবন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৮৩ সালে কলবাড়ী নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে যাত্রা শুরু। এরপর ২২ বছর নকিপুর সরকারি হরিচরণ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর তিনি ছিলেন বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার দায়িত্বে—কখনো কেন্দ্র সচিব, কখনো গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বাবধায়ক।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও ছিলেন সক্রিয়। সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এখনো। এছাড়া শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি, শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি ও স্কাউটসের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই পথচলায় তিনি পেয়েছেন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার স্বাদও—থাইল্যান্ডে ১৩ দিনের স্টাডি ট্যুর এবং মালয়েশিয়ায় আইসিটি প্রশিক্ষণ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে করেছে আরও প্রসারিত।

অবসর জীবনের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে যখন আবার শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা, তখন স্মৃতিরা যেন ফিরে আসে একে একে। পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রতিটি ইট, প্রতিটি বেঞ্চ যেন তাঁর শ্রমের সাক্ষী হয়ে কথা বলে।

কৃষ্ণানন্দ মুখার্জির কণ্ঠে মিশে থাকে এক ধরনের নীরব আবেগ—“সবকিছু এখন স্মৃতি। তবু মনে হয়, এই বিদ্যালয়টাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।”

সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলে যায়। কিন্তু কিছু মানুষের শ্রম, নিষ্ঠা আর ভালোবাসা—একটি প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে দেয়ালে অমলিন হয়ে থাকে চিরকাল।

সংবাদ টি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2020 All rights reserved
Design by: SHAMIR IT
themesba-lates1749691102
error: Content is protected !!