
নদীর কাছে সমুদ্র – কবি তানভীর আহমেদ
নদীকে একদিন জিজ্ঞেস করা হলো—
যে সমুদ্রের কাছে পৌঁছানোর জন্য
তুমি এতকাল পাহাড় ভেঙেছ,
পাথর ছুঁয়েছ,
অরণ্যের ছায়া পেরিয়ে এসেছ,
আজ সে তো তোমার একেবারে সামনে,
তবু তোমার জলে এত বিষণ্ণতা কেন?নদী তখন সন্ধ্যার আকাশে তাকিয়ে ছিল,
পশ্চিমে সূর্য ডুবে গেছে।
জলের ওপর শেষ আলোটুকু কাঁপছিল;
যেন কেউ বিদায় নেওয়ার আগে
বারবার ফিরে তাকাচ্ছে।নদী ধীরে বলল—
দূর থেকে সমুদ্রকে অসীম মনে হয়েছিল।
ভাবতাম, তার কাছে পৌঁছালেই
আমার সমস্ত একাকীত্ব শেষ হবে।
কিন্তু কাছে এসে দেখলাম
সমুদ্রও যে ভীষণ একা।তার বুকজুড়ে এত জল,
তবু তার কোনো তৃষ্ণা মেটে না।
এতদিন সমুদ্রকে পাওয়ার স্বপ্নেই
আমার স্রোত বেঁচে ছিল।
আমার প্রতিটি বাঁক ছিল তার দিকে,
প্রতিটি ঢেউ ছিল তার নামে।এখন সমুদ্রের খুবই কাছাকাছি,
ছুটে এসে হঠাৎ বুঝতে পারছি;
আমার এতদিনের ছুটে চলার
আসলে কোনো শেষ গন্তব্য ছিল না,
ছিল শুধু দূরত্ব ও তীব্র কৌতূহল।ছিল কাশফুলের দোলা,
বর্ষার গন্ধ,
জোছনায় ভেজা ঘাট,
অচেনা পাখির ডাক—
আর ছিল
কাউকে পাওয়ার এক অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা।কখনো কখনো অপ্রাপ্তিই
মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
কারণ অপ্রাপ্তির ভেতর
একটি ছোট্ট স্বপ্ন বেঁচে থাকে—
যাকে ছুঁতে নেই,
শুধু দূর থেকে ভালোবাসতে হয়।নদী একটু থামল।
জলের ওপর তখন
চাঁদের আলো নেমে এসেছে।
তারপর খুব নিচু স্বরে বলল—
আমি সমুদ্রকে পেয়ে গেছি ঠিকই,
কিন্তু তাকে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
হারিয়ে ফেলেছি সেই নদীটিকে,
যে সারাজীবন সমুদ্রের স্বপ্ন দেখত।সেদিনের পরও নদী সমুদ্রের দিকে যায়,
জোছনার রাতে যায়,
বৃষ্টির রাতে যায়,
অন্ধকারেও যায়।
কিন্তু তার স্রোতে আর
পৌঁছে যাওয়ার আনন্দ নেই।শুধু একটি অদ্ভুত ফিরে দেখা—
পেছনে ফেলে আসা তীরগুলোর দিকে;
যেখানে কোনো এক সন্ধ্যায়
সে নিজেকে নদী ভেবেছিল,
আর সমুদ্রকে ভেবেছিল—
ভালোবাসা।তানভীর
৩০ আগস্ট ২০২৬