সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৫৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ডুমুরিয়ায় খাল খননের উদ্বৃত্ত ১ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও সবিতা সরকার শেখ রিয়াজুল ইসলামের মৃত্যুতে তালা প্রেসক্লাবের শোক তালার সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের মৃত্যু, শেষ বিদায়ে মানুষের ঢল দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়ন শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা সাতক্ষীরা নিউ মার্কেট থেকে বাঁকাল ব্রীজ পর্যন্ত ড্রেনের উচ্চতা কমানোর দাবি ভবন মালিকদের দুধসংগ্রহকারী উদ্যোক্তাদের মাঝে ১০টি ভ্যান ও ৬০টি মিল্কক্যান বিতরণ তালার কৃষ্ণনগর সুইচগেট বন্ধ করে পাট পচন, জেলে সম্প্রদায়ের মানবেতর জীবনযাপন সাতক্ষীরায় পুলিশের সাপ্তাহিক মাস্টার প্যারেড অনুষ্ঠিত সাতক্ষীরায় আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত তালায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত

অমিতের চরিত্রের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে লাবণ্যকে কি আমরা ভুলে যাচ্ছি? তানভীর আহমেদ 

✍️দেশ টাইমস নিউজ ডেস্ক ✅
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৭ বার পড়া হয়েছে

গতকাল শুক্রবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠচক্রে ‘সপ্তাহে একটি বই পড়ি’ আয়োজনের অংশ হিসেবে সারাদিন কেটে গেল রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকের পাড়, সবুজের ভেতর হাঁটাহাঁটি, কবিতা আবৃত্তি, গান, আড্ডা—মনে হচ্ছিল, বইটি যেন শুধু পড়ছি না; বরং তার চরিত্রগুলোর সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য একই পৃথিবীতে বসবাস করছি। আর সেই দিনের মুক্ত আলোচনায় অমিত রায়ের চরিত্র নিয়ে একটি প্রশ্ন উঠতেই আমার ভেতরে জন্ম নিল আরেকটি প্রশ্ন—অমিতকে বিচার করতে গিয়ে আমরা কি লাবণ্যকে একটু বেশিই অব্যাহতি দিয়ে দিচ্ছি?

আলোচনায় অমিতের বিলেত-পর্বে কেতকীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, তাকে রিং পরানো এবং পরবর্তীতে শিলংয়ে এসে লাবণ্যকে রিং পরানোর প্রসঙ্গ উঠল। অমিতের এই আচরণকে তাঁর চরিত্রের দুর্বলতা ও নৈতিক অসংগতির প্রমাণ হিসেবে দেখা হলো। প্রশ্নটি একেবারে অমূলক নয়। কেতকীর প্রতি অমিতের দায় ছিল, এবং সেই দায়কে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমার মনে হলো—একই নৈতিক আয়নাটি যদি লাবণ্যর দিকেও ঘুরিয়ে ধরা হয়, তাহলে ছবিটা হয়তো আরও জটিল, আরও মানবিক হয়ে ওঠে।

কারণ লাবণ্যও তো অমিতকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিল। তার প্রেম কোনো অভিনয় ছিল না। অথচ অমিতকে হারানোর পর সে জীবনের সমস্ত দরজা বন্ধ করে একাকিত্বকে নিজের নিয়তি বানায়নি। সে শোভনলালের দিকে ফিরে গেছে; অর্থাৎ প্রেমের এক গভীর অধ্যায় শেষ হওয়ার পরও জীবনের আরেকটি সম্ভাবনাকে গ্রহণ করেছে। এখানে লাবণ্যর কোনো অপরাধ দেখি না—বরং দেখি মানুষের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু ঠিক একই মানবিক বাস্তবতার জায়গাটি অমিতের ক্ষেত্রে এলেই কেন সেটি চরিত্রের প্রশ্ন হয়ে ওঠে?

বরং এখানেই শেষের কবিতা আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য রাখে—প্রেম আর জীবন এক জিনিস নয়।

মানুষ কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, অথচ সেই মানুষটির সঙ্গে তার জীবন না-ও হতে পারে। আবার জীবনসঙ্গী হিসেবে যাকে গ্রহণ করে, তার প্রতিই হয়তো তার হৃদয়ের সবচেয়ে তীব্র প্রেম ছিল না। এই দুইয়ের মাঝখানে যে বিশাল অনিশ্চয়তা, রবীন্দ্রনাথ সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাঁর চরিত্রদের দাঁড় করিয়েছেন।

অমিতের ক্ষেত্রে কেতকী ছিল একটি প্রতিশ্রুত সম্পর্ক; লাবণ্য ছিল একটি আকস্মিক অথচ গভীর আবিষ্কার। অমিত যখন কেতকীকে কথা দিয়েছিল, তখন সে ভবিষ্যতের লাবণ্যকে চিনত না। মানুষ তো ভবিষ্যৎ প্রেমের পূর্বাভাস নিয়ে প্রেমে পড়ে না। সে যে মুহূর্তে ভালোবাসে, সেই মুহূর্তের অনুভূতিকেই সত্য বলে জানে। তারপর যদি জীবনের অন্য প্রান্ত থেকে এমন কেউ এসে দাঁড়ায়, যার সামনে নিজেরই অচেনা একটি সত্তা আবিষ্কৃত হয়, তখন পুরোনো সত্যটি মিথ্যা হয়ে যায় না; কিন্তু তার পাশে এসে দাঁড়ায় আরও গভীর এক সত্য।

আমার পাঠে, কেতকীকে অমিত হয়তো ভালোবেসেছিল; কিন্তু লাবণ্যর কাছে এসে সে প্রেমের গভীরতাকে চিনেছিল।

লাবণ্য অমিতের কাছে শুধু একজন নারী ছিল না। সে ছিল তার বুদ্ধির সমকক্ষ, রুচির প্রতিদ্বন্দ্বী, অহংকারের প্রতিপক্ষ এবং আত্মপরিচয়ের আয়না। অমিত লাবণ্যকে ভালোবেসে যেন নিজের ভেতরকার আরেক অমিতকে আবিষ্কার করেছিল। এই প্রেম শুধু শরীর বা সৌন্দর্যের আকর্ষণ নয়; এটি ছিল একটি মনের সঙ্গে আরেকটি মনের এমন সংঘর্ষ, যেখানে পরাজয়ও আনন্দের।

এ কারণেই অমিতকে কেবল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী হিসেবে দেখলে তার প্রেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি অদৃশ্য হয়ে যায়।

তবে এখানেই আরেকটি কঠিন প্রশ্ন আসে—তাহলে লাবণ্য কি অমিতের চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত?

সম্ভবত উত্তরটি এত সরল নয়।

লাবণ্য অমিতকে ভালোবেসেও শোভনলালের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি। শেষ পর্যন্ত সে শোভনলালকে বেছে নিয়েছে। অর্থাৎ অমিতের সঙ্গে তার প্রেম যতই গভীর হোক, জীবনকে সে একটি অনিশ্চিত অপেক্ষার হাতে সমর্পণ করেনি। সে বুঝেছিল—প্রেমের একটি সত্য আছে, আবার জীবনেরও একটি সত্য আছে।

এখানে লাবণ্যকে আমি দোষী করছি না; বরং এই মানবিক বাস্তবতাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি লাবণ্যর ক্ষেত্রে আমরা বলি—‘সে তো বাস্তব জীবন বেছে নিয়েছে’, তাহলে অমিতের ক্ষেত্রেও বলতে হবে—সে তার জীবনের এক পর্যায়ে নিজের আবিষ্কৃত প্রেমকে বাস্তবতার ওপর স্থান দিয়েছিল।

তবে দুজনের পরিণতিতে একটি অসাধারণ পার্থক্য আছে।

লাবণ্য অমিতকে হারিয়ে জীবনকে বেছে নিয়েছে। অমিত লাবণ্যকে হারিয়ে কী বেছে নিয়েছিল—রবীন্দ্রনাথ সেই উত্তরটিকে আমাদের কল্পনার জন্য অনেকটাই উন্মুক্ত রেখেছেন।

এই অনিশ্চয়তাটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়।

কারণ একজন মানুষ যখন সত্যিকার অর্থে গভীরভাবে ভালোবাসে এবং সেই মানুষটিকে হারায়, তখন তার সামনে দুটি পথ থাকে—সে আবার জীবনকে নতুন করে সাজাতে পারে, অথবা তার ভেতরে এমন একটি শূন্যতা তৈরি হতে পারে, যার আর কোনো পূর্ণতা আসে না। শেষের কবিতা অমিতের পরবর্তী জীবনকে সেই অর্থে সম্পূর্ণ করে দেয় না। ফলে অমিতের মধ্যে আমরা এমন এক পুরুষের সম্ভাবনাও দেখতে পাই, যে হয়তো জীবনের পথে এগিয়ে যাবে, কিন্তু লাবণ্যর জায়গাটি আর কোনোদিন পূর্ণ হবে না।

অন্যদিকে লাবণ্য শোভনলালকে গ্রহণ করে আমাদের দেখিয়ে দেয়—মানুষ তার গভীরতম প্রেম হারিয়েও জীবনকে থামিয়ে রাখে না।

এই জায়গাটিই অমিতের চরিত্রের আলোচনাকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ যদি অমিত কেতকীকে নিয়ে জীবন গুছিয়ে নিত, তাহলে হয়তো লাবণ্যর প্রেম তার কাছে একটি সুন্দর অথচ অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে থাকত। কিন্তু সে লাবণ্যকে ভালোবেসেছিল এত গভীরে যে, সেই প্রেমকে অস্বীকার করে পুরোনো জীবনে ফিরে যাওয়া তার পক্ষে সহজ ছিল না। আবার লাবণ্যর ক্ষেত্রে প্রেমকে হারানোর পরও জীবন তার সামনে থেমে থাকেনি।

তাই অমিতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়তো তার বহুগামিতা নয়; বরং তার প্রেমের তীব্রতা।

যে মানুষ খুব গভীরভাবে ভালোবাসে, তার দুর্বলতাও কখনো কখনো সেই গভীরতার মধ্যেই তৈরি হয়। কারণ সে সব সম্পর্ককে সমান ওজন দিয়ে দেখতে পারে না। কোনো কোনো মানুষ তার জীবনে আসে, আর তখন অন্য সব সম্ভাবনা হঠাৎ ফিকে হয়ে যায়। অমিতের ক্ষেত্রে লাবণ্য যেন সেই মানুষ।

এখানে অমিতের প্রতি আমার সহানুভূতি আছে, কিন্তু অন্ধ সমর্থন নেই। কেতকীর প্রতি তার দায় ছিল—থাকবেই। কিন্তু একজন মানুষকে ভালোবাসার অপরাধে তাকে চরিত্রহীন বলে দেওয়া যায় না। বরং দেখতে হবে—সে কেন সেই মানুষটির প্রেমে পড়েছিল, সেই প্রেম তার ভেতরে কী পরিবর্তন এনেছিল এবং কেন পুরোনো প্রতিশ্রুতির চেয়েও নতুন অনুভূতিটি তার কাছে সত্য হয়ে উঠেছিল।

একইভাবে লাবণ্যকেও নিষ্পাপ প্রেমের প্রতিমূর্তি বানিয়ে অমিতকে একা অভিযুক্ত করাও অসম্পূর্ণ পাঠ।

কারণ লাবণ্যও জানত—জীবন অপেক্ষা করে না।

অমিতের সঙ্গে তার প্রেম ছিল হৃদয়ের; শোভনলাল হয়ে উঠেছিল জীবনের। আর এই দুইয়ের ব্যবধানেই হয়তো শেষের কবিতা-র সবচেয়ে গভীর দর্শনটি লুকিয়ে আছে।

প্রেম সবসময় জীবনসঙ্গী দেয় না; আবার জীবনসঙ্গী সবসময় মানুষের সবচেয়ে গভীর প্রেমও হয় না।

কেতকী ছিল অমিতের জীবনের একটি সত্য।
লাবণ্য ছিল তার গভীরতর সত্য।

শোভনলাল ছিল লাবণ্যর জীবনের একটি সম্ভাবনা।
অমিত ছিল তার আবিষ্কৃত প্রেম।

তবু শেষ পর্যন্ত দুজনেই নিজেদের মতো করে জীবনকে বেছে নিয়েছে—অথবা অন্তত বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

তাই অমিতকে বিচার করতে গিয়ে আমার মনে হয়, প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—‘সে কেন কেতকীকে কথা দিয়েও লাবণ্যকে ভালোবাসল?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘মানুষ যখন তার দেওয়া কথার চেয়েও গভীর কোনো সত্য আবিষ্কার করে, তখন কোনটিকে বেছে নেওয়া উচিত—প্রতিশ্রুতিকে, না নিজের হৃদয়ের সত্যকে?’

রবীন্দ্রনাথ সেই প্রশ্নের সরল উত্তর দেননি। তিনি শুধু অমিত ও লাবণ্যকে সেই প্রশ্নের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।

আর সেই কারণেই অমিতকে আমার চরিত্রহীন মনে হয় না। সে ভুল করেছে, দ্বিধায় পড়েছে, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্রেমের সংঘাতে জড়িয়েছে; কিন্তু তার প্রেমকে মিথ্যা বলা যায় না।

অমিতের অপরাধ থাকলে তা তার সিদ্ধান্তে; তার প্রেমের সত্যে নয়।

আর লাবণ্যর মহত্ত্ব যদি কোথাও থাকে, তবে শুধু অমিতকে ভালোবাসায় নয়—অমিতকে হারানোর পরও জীবনকে থামিয়ে না রাখার মধ্যেও।

এই দুই বিপরীত সত্যের মাঝখানেই শেষের কবিতা তার অসাধারণ মানবিকতা খুঁজে পায়।

গতকালের পাঠচক্র থেকে ফিরে তাই মনে হলো—অমিতকে রায় দেওয়ার আগে হয়তো আমাদের একটু থামা দরকার। কারণ রবীন্দ্রনাথের চরিত্ররা আদালতের আসামি নয়; তারা আমাদেরই মতো মানুষ—ভালোবাসে, ভুল করে, দ্বিধায় পড়ে, হারায়, আবার বাঁচে।

অমিত নিখুঁত নয়। লাবণ্যও নয়।
আর ঠিক এই অসম্পূর্ণতার কারণেই তারা এত সত্য।

হয়তো শেষের কবিতা-র সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই—
কিছু প্রেম জীবন হয়ে ওঠে না; কিন্তু জীবনের সংজ্ঞা বদলে দিয়ে যায়।

অমিতের কাছে লাবণ্য ছিল সেই প্রেম।
আর লাবণ্যর কাছে অমিত—সম্ভবত সেই অসমাপ্ত অধ্যায়, যার পরেও জীবন থেমে থাকেনি।

 লেখক: তানভীর আহমেদ, কবি ও সাহিত্যিক 
১৫ আগস্ট, ২৬
খুলনা

সংবাদ টি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2020 All rights reserved
Design by: SHAMIR IT
themesba-lates1749691102
error: Content is protected !!