
সাতক্ষীরা শহরের বুকে আমতলা মোড় সংলগ্ন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে দীনেশ কর্মকারের বাড়ির সেই বধ্যভূমি কিংবা ঝাউডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় মাঠের সেই স্মৃতি আজও মনে করিয়ে দেয় ১৯৭১-এর সেই রক্তঝরা দিনগুলোর কথা। বীরত্ব আর বিষাদের সেই ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেই ‘দৈনিক পত্রদূত’ কার্যালয়ে পালিত হলো মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ ‘২৬) সন্ধ্যায় পত্রিকা অফিসে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় মূল সুর ছিল—স্মৃতির মিনার বেয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও দেশপ্রেমিক সমাজ বিনির্মাণ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দৈনিক পত্রদূতের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ। সহকারী সম্পাদক (সাহিত্য) সৌহার্দ্য সিরাজের কাব্যিক ও সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি কেবল আলোচনা নয়, হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
বধ্যভূমির আর্তনাদ ও বীরত্বের ইতিহাস আলোচনায় উঠে আসে সাতক্ষীরা জেলার গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিসংগ্রামের কথা। বক্তারা স্মরণ করেন ১৯৭১-এর এপ্রিলের সেই ভয়াল স্মৃতি, যখন পাকিস্তানি বাহিনী সাতক্ষীরা শহরে প্রবেশ করে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল। বিনেরপোতা সেতু, ঝাউডাঙ্গা, পারুলিয়া এবং তালা উপজেলার মাগুরা বধ্যভূমিতে যে হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ আমরা স্বাধীন। বিশেষ করে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে সাতক্ষীরার দামাল ছেলেদের প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সাতক্ষীরাকে শত্রুমুক্ত করার বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ দেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানের সভাপতি, দৈনিক পত্রদূতের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ তাঁর বক্তব্যে সাতক্ষীরার ধুলিকণায় মিশে থাকা মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোকে এক সুনিপুণ শব্দচিত্রের মতো তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সাতক্ষীরার মাটি কেবল লোনা জলের নয়, এ মাটি বীরত্বের রক্তে ভেজা।
তিনি বলেন, “আমরা কি ভুলতে পারি সেই সাহসী ন্যাশনাল ব্যাংক অপারেশন কিংবা শত্রুর বুক কাঁপিয়ে দেওয়া পাওয়ার হাউস অপারেশনের কথা? কপিলমুনির সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কিংবা টাউনশ্রীপুরের প্রতিরোধ আজও আমাদের ধমনিতে শিহরণ জাগায়।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তাঁর কণ্ঠে উঠে আসে বিষাদময় স্মৃতি। তিনি বর্ণনা করেন বুধহাটায় পাকিস্তানি হানাদারদের সেই পৈশাচিক নির্যাতন এবং চুকনগর গণহত্যার কথা—যেখানে হাজার হাজার মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ভদ্রা নদীর জল। তিনি বলেন, “চুকনগর কেবল একটি নাম নয়, এটি পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও নৃশংসতম গণহত্যার এক নীরব সাক্ষী।”
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার এক খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “৫৫ বছরে আমরা অবকাঠামোতে এগিয়েছি সত্য, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। আজ আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই চেতনার মশালটি নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া। আমাদের প্রত্যাশা, সাতক্ষীরার তরুণরা যেন বধ্যভূমির সেই রক্তঋণ ভুলে না যায় এবং দেশপ্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একটি সুনাগরিক সমাজ গড়ে তোলে।”
নাগরিক নেতা অধ্যাপক ইদ্রিস আলীজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “আমাদের ইতিহাস কেবল যুদ্ধের নয়, আমাদের ইতিহাস ত্যাগের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর।”
পত্রিকার বার্তা সম্পাদক এস এম শহীদুল ইসলাম ও চিফ রিপোর্টার মো. আব্দুস সামাদ তাঁদের বক্তব্যে বলেন, “বধ্যভূমিগুলো আমাদের শোকের প্রতীক নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তির উৎস।” লেখক ও সাহিত্যিক মনিরুজ্জামান মুন্না এবং সাখাওত উল্যাহ মনে করিয়ে দেন যে, সাতক্ষীরার মাটি যেমন উর্বর, তেমনি এ মাটির মানুষের দেশপ্রেমও প্রখর।
আয়োজনে কবিতার পঙক্তি আর দেশাত্মবোধক গানের সুর শোকাতুর পরিবেশকে এক লহমায় বদলে দেয় বিজয়ের উল্লাসে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন লেখক ও সাহিত্যিক জাহিদুর রহমান, আবদুল জব্বার, মো. আব্দুল্লাহ, সাংবাদিক মো. হোসেন আলী, ইব্রাহীম খলিল, জিএম আমিনুল হক, শেখ আব্দুল আলিম প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, হাজার বছরের বঞ্চনা আর শোষণের ইতিহাস মুছে দিয়েছিল একাত্তরের সেই বজ্রকণ্ঠ। আজ সেই চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে মেধা ও মননশীলতায় ঋদ্ধ একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।