নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: সমতার গণতন্ত্র গড়তে নেতৃত্বে সমঅংশগ্রহণের বিকল্প নেই
✍️দেশ টাইমস নিউজ ডেস্ক ✅
প্রকাশের সময় :
বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
৪২
বার পড়া হয়েছে
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সকল নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ ও সমান সুযোগ। কিন্তু বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরে তাদের অংশগ্রহণ এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। সংবিধান নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করলেও বাস্তবে রাজনৈতিক দলের বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অধিকাংশ কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব সীমিত। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণে নারীর অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারের যথাযথ প্রতিফলন ঘটে না।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগ বা নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই নিশ্চিত হয়, যখন নারীরা রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণ, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। নেতৃত্বের অবস্থানে নারীর উপস্থিতি শুধু লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠাই করে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, শিশু অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবিক উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আরও অগ্রাধিকার দেয়।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি ইতিবাচক দিক হলেও দলীয় কাঠামোর মূল নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রেই তারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে থেকে যান অথবা প্রতীকী প্রতিনিধিত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেন। একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের জন্য এই বাস্তবতা পরিবর্তন করা জরুরি।
রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অগ্রযাত্রার পথে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সামাজিক কুসংস্কার, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক দায়িত্বের অসম বণ্টন, রাজনৈতিক সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দলীয় কাঠামোর বৈষম্য—এসব কারণে অনেক যোগ্য নারী নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ পান না। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে দক্ষ ও সম্ভাবনাময় নারী নেতৃত্বের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
দলীয় কমিটিতে নারীদের শুধু সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদগুলোতেও যোগ্য ও দক্ষ নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নারী নেতৃত্ব বিকাশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক দক্ষতা উন্নয়ন, রাজনৈতিক পরামর্শদান, নিরাপদ অংশগ্রহণের পরিবেশ এবং আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। নেতৃত্বের বিকাশ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; তাই পরিকল্পিতভাবে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বেশি, সেখানে সুশাসন, জবাবদিহিতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানব উন্নয়নের সূচকও তুলনামূলকভাবে উন্নত। নারীর অংশগ্রহণ নীতিনির্ধারণকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনমুখী করে তোলে। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে কোনো বিশেষ সুবিধা বা অনুগ্রহ হিসেবে নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নারীর সক্ষমতার বহু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, কূটনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা খাতে নারীরা দক্ষতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বর্তমানে আমাদের দেশে ৬৪ জেলার মধ্যে ২১ জেলায় নারী জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ৪৯৯টি উপজেলার মধ্যে ১৯১টিতে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে রাজনৈতিক নেতৃত্বেও নারীরা সমান দক্ষতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।
সাতক্ষীরার রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি এখনও সীমিত। এর প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক মানসিকতা, দলীয় নেতৃত্বে নারীদের কম সুযোগ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও নেটওয়ার্কের অভাব।
রাজনৈতিক দলে নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা প্রদান, এবং পরিবার ও সমাজে নারীর নেতৃত্বকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাতক্ষীরার রাজনীতিতে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হবে।
এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার। বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড—প্রতিটি স্তরের কমিটিতে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কমিটি গঠনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, মেধা ও লিঙ্গসমতার নীতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে নারীরা কেবল উপস্থিতিই নয়, কার্যকর নেতৃত্বও দিতে পারেন।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কোনো একক গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের পূর্বশর্ত। নারী ও পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব ছাড়া উন্নয়নের সুফল সর্বস্তরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের গণ্ডি পেরিয়ে নারীদের প্রকৃত নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে স্থান দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র এবং সমাজ যদি এ বিষয়ে আন্তরিক ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনগণমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল সংবাদিক, উন্নয়ন ও মানবাধিকারকর্মী