
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা জেলাতে গ্রামাঞ্চলের ধনি পরিবারে ধান রাখার জন্য শোভা পেত ধানের গোলা। কালের বিবর্তনে এ অঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে ধানের গোলা। এক সময় মাঠ ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, আর গোলাভরা ধান গ্রামের সম্ভ্রান্ত কৃষকের পরিচয় বহন করত। সভ্যতার বিবর্তনে আর আধুনিক কৃষি সংক্ষণের পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে হারাতে বসেছে কৃষকের ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা, সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলের ধনী কৃষকের বাড়ীর উঠানে শোভা পেতো ধান রাখার এই গোলাঘর। এখন সেটা আর চোঁখে পড়েনা সেটা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে।
বাঁশ দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি গোল আকৃতির কাঠামোই গোলা ছোট বড় মানের ভেদে ১০০ থেকে ৩০০ মন ধান সংরক্ষন করা হতো এই গোলায়।
সাতক্ষীরা সদরের নলকুড়া গ্রামের মৃত আব্দুল কুদ্দুস এর ছেলে আব্দুল বারী জানান, ছোট বেলায় দেখছি আমাদের বাবার পুরাতন বাড়িতে ধান সংরক্ষণ করে রাখার জন্য ধানের গোলা। কালের বিবর্তনে এখন ধানের গোলায় ধান সংরক্ষণ করা হয় না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই ধান রাখার গোলা চিনবেই না।
নলকুড়া গ্রামের মৃত শেখ আজাদ হোসেন (আজাদ বাবুর্চি) ছেলে সাংস্কৃতিক কর্মী শেখ আলমগীর হোসেন জানান, ছোট বেলায় দাদী ও মায়ের মূখে শুনেছি আমার দাদার বাড়িতে ৪/৫ টা ধানের গোলা ছিলো, খড়া ও বর্ষ মৌসুমে চালের যোগান হিসেবে এই ধানের গোলায় ধান মজুদ করে রাখা হতো, আমিও ছোট বেলায় অনেক বাড়িতে এই ধানের গোলা দেখছি, বাট এখন আমাদের ছেলে মেয়েদের এই ধানের গোলের গল্প করলে তারা তো চেনেই না বরং হাসি তামাশা করে। এই সব শিল্পকে ধরে না রাখতে পারলে পর্ববর্তী প্রজন্ম জানবে ও দেখবে কি করে? তিনি আরো বলেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগকে এই সব শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
দেবহাটার দক্ষিণ কুলিয়া গ্রামের কৃষক মনো গাজী বলেন, আমরা সেই ছোট থেকে দেখে আসছি গ্রামে যাদের অনেক ধান হতো তারা সেগুলা সংরক্ষণ করে রাখার জন্য এই গোলার ব্যবহার করতো, কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই গোলা ঘর এর প্রয়োজন হয় না।
দেবহাটার সখিপুর গ্রামের বাঁশের গোলা তৈরি মিস্ত্রি এলাহি বক্স কারিগর বলেন, আমি আশি-নব্বই দশকের দিকে গোলা তৈরির কাজ করতাম তখন একটি গোলা তৈরি করতে খরচ হত সেই সময়কার ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা,যা এখন তৈরি করতে গেলে যা খরচ হবে প্রায় ১লক্ষ টাকার অধিক, তাছাড়া এটা তৈরী করতে সময়ও লাগে।
দেবহাটা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শাহিনা খাতুন বলেন, বর্তমান আধুনিক যুগে কেহ গোলা ব্যবহার করে না, বর্তমান কৃষকেরা ধান সহ অন্যান্য ফসল সমুহ সংরক্ষন করার জন্য চটের বস্তা,পলিথীনের বস্তা কিংবা প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শোয়াইব আহমেদ বলেন, ধানের গোলা একটি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প, এই শিল্পটি বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে। এই শিল্পকে আমাদের ধরে রাখতে হবে না হলে পরবর্তী প্রজন্ম শিখবে কোথা থেকে।
দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, অনেক আগে গোলার ব্যবহার দেখেছি, কিন্তু বর্তমান জেনারেশন গোলার ব্যবহার কি ভাবে করতে হয় সেটাও জানে না অনেকই। বর্তমান সময়ে গোলা ব্যবহার চোখে পড়ে না, তাছাড়া গোলা তৈরী করতে সময় লাগে ও ব্যয় বহুল, তাছাড়া খাদ্যসষ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছুটা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বস্তা ও ড্রামে কাঁচা-পাকা/পাকা ঘরের মধ্যে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে খাদ্য সষ্য ভালো থাকে। সবমিলিয়ে বর্তমানে গোলার ব্যবহার আর দেখা যাচ্ছে না, গ্রাম বাংলার বাঁশের তৈরী গোলার ব্যবহার এখন বিলুপ্তির পথে।