জাতীয়

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের কড়া আপত্তি

জাতীয় ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফলো করুন
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের মেসেঞ্জার

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকিরের সম্প্রতি দেয়া এক বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করতে পিছপা হবে না। এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। সোমবার পৃথক বিবৃতিতে সংস্থা দুটি জানায়, এমন মন্তব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনীর ব্যর্থতা ও দুর্বলতাকে ঢাকার একটি বিপজ্জনক প্রচেষ্টা। ঐ সময়ে ভিন্নমভাবলম্বী ও রাজনৈতিক নেতা কর্মী সহ সাধারণ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অপরাধ দমনে ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে পুলিশ প্রধান ক্রসফায়ারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন কিনা—সেটি এখন বড় প্রশ্ন। তার মতে, পুলিশের মূল কাজ হলো পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা। ক্রসফায়ারকে সমাধান হিসেবে তুলে ধরা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই নয়, বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের পরিচায়ক। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবনের নিরাপত্তা ও আইনের আশ্রয়লাভ নাগরিকের মৌলিক অধিকার, যা কোনো অবস্থাতেই নির্বাহী আদেশে বাতিলযোগ্য নয়। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কিনা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

অতীতের বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ টেনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সিনহা হত্যা মামলা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা কিংবা টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনা পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, বর্তমান সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে হাঁটবে না। এমন সরকারি অবস্থানের বিপরীতে পুলিশ প্রধানের এ ধরনের মন্তব্য কতটা সাংঘর্ষিক, তার ব্যাখ্যা দাবি করেছে টিআইবি। পাশাপাশি আইজিপি’র বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। তিনি আরও বলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড এবং মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এ পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের প্রকাশ করা অডিও এবং হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল। এরপরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে সংস্থাটি।

অধিকার তাদের বিবৃতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সংস্থাটির মতে, ফ্যাসিবাদী শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে দেশজুড়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, পুলিশ প্রধানের এই বক্তব্য সেই পুরনো চর্চাকেই উসকে দেয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইতিমধ্যে অন্তত ৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে অধিকার। এ ধরনের মন্তব্য মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের জন্য বেআইনি বলপ্রয়োগের একটি প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে সংস্থাটি শঙ্কা প্রকাশ করেছে। ওদিকে, বিবৃতিতে অধিকার জানায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাড়ে ১৫ বছর শাসনামলে ব্যাপকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে বিলুপ্ত র‌্যাব (বর্তমানে এসআরবি) কে যুক্তরাষ্ট্র কালো ভালিকা ভুক্ত করে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতিমধ্যে ৫ টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে অধিকার ডকুমেন্ট করেছে।

টিআইবি ও অধিকার উভয়ই জোর দিয়ে বলেছে যে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিচারবহির্ভূত হত্যার কোনো স্থান নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, শুধুমাত্র জীবন রক্ষায় চূড়ান্ত পরিস্থিতিতেই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, একে বিচারবহির্ভূত হত্যার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা আইনসম্মত নয়। সাংবাদিকদের সমালোচনা প্রসঙ্গে টিআইবি স্পষ্ট করেছে যে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ঢালাও অভিযোগ স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।

পরিশেষে, পুলিশের কাজের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আইনানুগ কাঠামোর মধ্যে তাদের পরিচালনা করাই এখন সময়ের দাবি। পুলিশ বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির মুখে এ ধরনের বেপরোয়া বক্তব্য কেবল জননিরাপত্তার প্রতি ঝুঁকিই তৈরি করে না, বরং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। টিআইবি ও অধিকার অবিলম্বে এই বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।