মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অবরোধের বার্ষিক বিতর্ক চলাকালে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। আলোচনার এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার প্রতিনিধিদের মধ্যে চরম বাক্য বিনিময় ও হট্টগোল শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ সময় সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান হস্তক্ষেপে বাধ্য হন এবং অধিবেশন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ নিয়ে বার্ষিক বিতর্ক চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারের সমালোচনা করে দেশটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। ওয়াল্টজের এই বক্তব্যের প্রতিবাদে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পারিল্লাসহ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন এবং টেবিল চাপড়ে তীব্র আপত্তি জানান। পরিস্থিতি শান্ত করতে খলিলুর রহমান বারবার হাতুড়ি ঠুকে সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। ওয়াল্টজ তখন বলেন, ‘আমি আশা করি, জনাব সভাপতি, সবাই এখন প্রতিনিধিদলের বক্তব্য শুনছেন।
বক্তৃতাকালে ওয়াল্টজ কিউবার রাজনৈতিক অবস্থার সমালোচনা করে বলেন, হাভানায় এ ধরনের প্রশ্ন তুললে নাগরিকদের পরিণতি কী হতে পারে, তা ভাবা উচিত। এর জবাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ওয়াল্টজকে লক্ষ্য করে তিনি আরও বলেন, এটি জাতিসংঘ এবং এখানে আমেরিকা রয়েছে, কিউবার কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্র নয়। কোনো প্রতিনিধি তাকে বা তার সহকর্মীদের চুপ করাতে পারবেন না বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
উত্তেজনা একপর্যায়ে চরমে পৌঁছালে রদ্রিগেজ পারিল্লা সভাকক্ষের সামনের দিকে এগিয়ে যান। তখন ওয়াল্টজ তাকে বক্তৃতামঞ্চ থেকে দূরে সরে যেতে বলেন এবং চিৎকার করে দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে তাকে কেউ ভয় দেখাতে পারবে না। এই পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে খলিলুর রহমান অধিবেশন সাময়িক স্থগিত করেন। পরে তিনি আলোচনার প্রক্রিয়া ও নিয়ম ব্যাখ্যা করে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কথা বলার সুযোগ দেন, তবে ওয়াল্টজের মূল বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা না করার শর্ত দেন।
নিজের আসনে ফিরে রদ্রিগেজ পারিল্লা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অভিযোগকে ‘নির্লজ্জ মিথ্যাচার’ হিসেবে অভিহিত করেন। পরে ওয়াল্টজ তার বক্তব্য শেষ করেন এবং সদস্যদেশগুলোকে কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধের নিন্দা জানিয়ে আনা প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। বুধবার এই প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা ছিল।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রদ্রিগেজ পারিল্লা ওয়াল্টজের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, ওয়াল্টজ ভুলে গেছেন তিনি জাতিসংঘে আছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে নন। তার মতে, এ ধরনের আচরণে ওয়াল্টজ নিজের অযোগ্যতা ও অক্ষমতারই পরিচয় দিয়েছেন। একই সময়ে তিনি ঘোষণা করেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করবেন।
উল্লেখ্য, ওয়াল্টজ যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী গ্রিন বেরেটসের সাবেক সদস্য। এর আগেও বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। গত বছর ইয়েমেনে হুথিদের ওপর হামলা নিয়ে আলোচনার সময় সিগন্যাল গ্রুপে ভুলবশত এক সাংবাদিককে যুক্ত করার একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন। এমনকি তিনি গ্রিন বেরেটস নামে পরিচিত মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনীর কোনো ইউনিটে কিংবা সিগন্যালের কোনো গ্রুপেও নেই। ওই গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ছিলেন।
কিউবার ওপর কয়েক দশকের মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতিবছরই প্রস্তাব তোলা হয়। এবারও ওয়াশিংটনের অবরোধ নীতির পক্ষে ও বিপক্ষে দুই দেশের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ দেখা গেল।








