বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৩:৩০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
সম্প্রীতির সুতোয় গাঁথা কলারোয়ার মুরারিকাটি মেলা: লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য উৎসব কালিগঞ্জে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মৌ খামারিদের মাঝে বিনামূল্যে মৌ বাক্স ও রাণী মৌমাছি বিতরণ কলারোয়াতে তথ্য অধিকার আইন কর্মশালা মরহুম আনিছুর ও ডেভিড স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনালে ব্লিস হসপিটাল চ্যাম্পিয়ন  কলারোয়ায় গ্রাম আদালতের সমন্বয় সভা ভোমরা ইউনিয়নে এমএসপি ও এমএনপি সদস্যের দ্বি- মাসিক সমন্ময় সভা অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য পদ পেলেন সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান কাজী সাজেদুর রহমান দেবহাটায় অ বৈ ধ ভা বে বালু উ ত্তো ল নে জ রি মা না দেবহাটায় গ্রাম আদালতের ত্রৈমাসিক সমম্বয় সভা অনুষ্ঠিত একটি হুইল চেয়ারের জন্য বৃদ্ধা আফিয়ারা বেগমের আকুতি!

সম্প্রীতির সুতোয় গাঁথা কলারোয়ার মুরারিকাটি মেলা: লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য উৎসব

✍️এস এম শহিদুল ইসলাম📝 জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক✅
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬
  • ৩২ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বেত্রাবতীর নদের কোল ঘেঁষে অবস্থিত মনোরম ও শান্ত গ্রাম মুরারিকাটি। বছরের অন্য সময় গ্রামটি নিঝুম থাকলেও বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার এলেই পাল্টে যায় এর রূপ। গ্রামের জেলেপাড়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এক মহোৎসব। চার দিনব্যাপী এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ “তাল মেলা”। এটি কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ যেন এক প্রাণের মিলনমেলা। এখানে যারা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন তারা অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের। মেলায় দেখা মিললো কয়েকটি মুসলিম দোকান। এতে বোঝা যায়—এ মেলা সবার জন্য। এ মেলা অনেকের কাছে জীবিকা আবার অনেকের কাছে বিনোদনের সরস উৎস।

​বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই মেলাটি মূলত বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়। স্থানীয়দের মতে, পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই এই তিথিতে বিশেষ পূজা ও উৎসব পালিত হয়ে আসছে। জেলেপাড়ার মানুষেরা তাদের সারা বছরের কষ্ট ভুলে মেতে ওঠেন এই আনন্দে। চার দিনব্যাপী এই উৎসবে কলারোয়া উপজেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।

​মেলার মূল প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে আশপাশে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে এই সময় উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়-স্বজনরা এই মেলা উপলক্ষে বাড়িতে ফিরে আসেন।

​গ্রামীণ মেলার কথা উঠবে আর সেখানে মিষ্টি থাকবে না, তা কি হয়? মুরারিকাটির মেলার প্রধান আকর্ষণই হলো বাহারি সব মিষ্টির পশরা। মেলার মূল গলিতে ঢুকেই নাকে এসে লাগে ভাজা জিলিপি আর ছানার মিষ্টির সুবাস। একেকটি রসগোল্লার আকার দেখে চোখ ছানাবড়া হওয়া ছাড়া উপায় নেই। বালুশাই, গজা, চমচম, ছানার সন্দেশ আর কলারোয়ার বিখ্যাত দইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন কয়েক প্রজন্মের অভিজ্ঞ কারিগরেরা। মিষ্টির পাশাপাশি শিশুদের জন্য কদমা, বাতাসা, আর মুড়িমুড়কির স্তূপ যেন এক রঙিন জগত তৈরি করে।

​ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে দোকানীদের হিমশিম খেতে হয়। অনেক দর্শনার্থী শুধু বাড়ির জন্য মিষ্টি কিনতেই এই মেলায় আসেন।

​জ্যৈষ্ঠের আগমণী বার্তায় বৈশাখের তপ্ত দুপুরে স্বস্তি নিয়ে আসে এই মেলা। এখানকার অন্যতম বিশেষত্ব হলো মৌসুমি ফলের সমারোহ। মাঠ জুড়ে বসে তালের শাঁসের দোকান। কচি তালের শাঁসের জন্য কাড়াকাড়ি লেগে যায় দর্শনার্থীদের মধ্যে। এর পাশাপাশি লাল টকটকে লিচু, হিমসাগর ও গোবিন্দভোগ আম এবং পাকা কলার ম ম ঘ্রাণে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে সজীব।

​রোদ থেকে বাঁচতে মেলায় আসা মানুষের হাতে হাতে দেখা যায় নকশা করা তালপাতার পাখা। স্থানীয় কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এই পাখাগুলো মেলার এক অনন্য উপহার। প্রযুক্তির যুগেও এই মেলায় হস্তশিল্পের কদর কমেনি একটুও।

​আধুনিক বিনোদনের যুগেও মুরারিকাটি মেলা তার নিজস্ব লোকজ বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে। শিশুদের জন্য এখানে রয়েছে— কাঠের তৈরি রাইডার, কাপড়ের তৈরি বিশেষ মঞ্চ—যার উপর তারা নাচতে পারে, লাফাতে পারে। শিশুদের আনন্দ আর চিৎকারে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে। রঙিন মাটির ঘোড়া, হাতি আর বাঁশি বিক্রি হয় দেদারসে। মেলায় আসা শিশুদের মূল আকর্ষণ থাকে ছোটখাটো জাদুর খেলা আর বায়োস্কোপ দেখা।

​রাত নামলে এ মেলার রূপ বদলে যায়। রাতে কোন অনুষ্ঠান হয় না। নিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা। হারমোনিয়াম আর তবলার তালে গ্রামের মানুষেরা মুগ্ধ হয়ে শোনেন লোকজ কাহিনী। এসব যাত্রাপালায় বীরত্ব, ভক্তি আর সাম্যের কথা ফুটে ওঠে, যা সাধারণ মানুষকে এখনো সমানভাবে আকৃষ্ট করে।

​মুরারিকাটির এই মেলার সবচেয়ে বড় সার্থকতা এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। যদিও এটি জেলেপাড়ার ধর্মীয় অনুষঙ্গ ঘিরে শুরু হয়, কিন্তু কালক্রমে এটি সাতক্ষীরাবাসীর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ ভেদাভেদ ভুলে এখানে সমবেত হয়।

​মেলায় আসা দর্শনার্থী শিক্ষক নেতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, কলেজ শিক্ষার্থী রাবেয়া সুলতানা, আসাদুজ্জামান, আমিনুল হক, মেহেদী হাসান শিমুল, মাধবী মন্ডল, চিত্রা মন্ডল, পলাশ মন্ডলসহ অনেকেই বলছিলেন, “আমাদের এই মেলায় কোনো ভেদাভেদ নেই। আমার মুসলমান বন্ধুরা এই দিনে আমাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে আসে, আবার আমরাও তাদের উৎসবে যাই। এই মেলার মাঠটি যেন শান্তির এক ছোট রাজ্য।

মেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভ কুমার মন্ডল বলেন, প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার কালিপূজার মধ্যে দিয়ে এ মেলা শুরু হয়। এরপর এখানে ধর্মীয় যাত্রাপালা, কবিগান, আবৃত্তি, অভিযোগসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। চারদিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। সম্প্রীতির বন্ধনে শত শত বছর ধরে এখন উৎসব পালিত হচ্ছে। মেলার চতুর্থ দিনে শ্রী শ্রী শীতলা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন দেবীর বিদায় ও বিসর্জন উপলক্ষে সিঁদুর খেলাসহ গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানান খেলায় মেতে ওঠেন মা-বোনেরা। তিনি আরও বলেন— প্রায় শত মণ বাতাশা ও সন্দেশ বিতরণ করা হয় মেলায় আসা ভক্তদের মাঝে। শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এ মেলার অনন্য বৈশিষ্ট।

কমিটির সভাপতি নির্মল মন্ডল বলেন,​প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয় যাতে উৎসবে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। মেলার প্রতিটি দিনই শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় মেলায় আসা লাখো মানুষের হৃদয়ে।

​সাতক্ষীরার কলারোয়ার মুরারিকাটি জেলেপাড়ার এই মেলা কেবল কেনাকাটা বা বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের শেকড় চেনার এক সুযোগ। যান্ত্রিক জীবনের চাপে যখন গ্রামবাংলার অনেক সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে, তখন মুরারিকাটির এই চার দিনের উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির শক্তির কথা। কপোতাক্ষের তীরের এই লোকজ মেলা বেঁচে থাকুক অনন্তকাল—এমনটাই প্রত্যাশা মেলায় আসা প্রতিটি দর্শনার্থীর।

সংবাদ টি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2020 All rights reserved
Design by: SHAMIR IT
themesba-lates1749691102
error: Content is protected !!