বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৭:০৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
স ড় ক দু র্ঘ ট না য় আ হ ত সাংবাদিক মাসুদ রানার সুস্থতা কামনা সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদের  গোবিপ্রবিতে ভেটেরিনারি টিচিং হাসপাতালের উদ্বোধন আগরদাঁড়ি ইউনিয়ন আমীরসহ তিন মরহুমের জানাজায় শোকাবহ পরিবেশ টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না শ্যামনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী জাহিদ সম্প্রীতির সুতোয় গাঁথা কলারোয়ার মুরারিকাটি মেলা: লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য উৎসব কালিগঞ্জে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মৌ খামারিদের মাঝে বিনামূল্যে মৌ বাক্স ও রাণী মৌমাছি বিতরণ কলারোয়াতে তথ্য অধিকার আইন কর্মশালা মরহুম আনিছুর ও ডেভিড স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনালে ব্লিস হসপিটাল চ্যাম্পিয়ন  কলারোয়ায় গ্রাম আদালতের সমন্বয় সভা ভোমরা ইউনিয়নে এমএসপি ও এমএনপি সদস্যের দ্বি- মাসিক সমন্ময় সভা অনুষ্ঠিত

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ভাষা সৈনিক লুৎফর রহমান সরদারকে নিয়ে স্ত্রীর লেখা ইতিহাস

✍️মীর খায়রুল আলম📝দেবহাটা প্রতিবেদক✅
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬
  • ১৭৪ বার পড়া হয়েছে

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ভাষা সৈনিক লুৎফর রহমান সরদারকে নিয়ে তার স্ত্রীর লেখা দুর্লভ ইতিহাস যা আজ নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে অজানা। তার স্ত্রীর লেখা ইতিহাস হুবহু তুলে ধরা হল: কারিমুন নেছার জন্ম তারিখ ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৪২। ইংরেজি ১৯৫৯ ও বাংলা ১৩৬৫ সালের ১৩ আষাঢ় আমার বিয়ে হয় দেবহাটার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা সৈনিক লুৎফর রহমান সরদারের সাথে।

তিনি কমরেড মনি সিং এর বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। মনি সিংকে নিজের চোখেও দেখেছি আমাদের বাড়ীতে আসা যাওয়া করতে। পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রি জ্যোতি বসুকেও দেখেছি আমাদের বাড়ীতে আসতে। সে সময়ে আমি জানতে পেরেছিলাম যে ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার কারনে আমার স্বামীকে ১৯৫২ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তখনকার ঢাকার একটি দৈনিক সংবাদ পত্রের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন মাহবুবুর রহমান খান। তিনি আমার স্বামীকে বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন। তৎকালীন নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন আমার স্বামী লুৎফর রহমান সরদার। উনি তৎকালীন সি.পি.পি নেতা কমরেড মনি সিং, কমরেড নেপাল নাগ, অজয় রায়, বারীন দত্ত, সংবাদপত্রের সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী এবং আরো অনেকের সাথে কাজ করেন। পরবর্তীতে আয়ুব খান সরকার আমার স্বামীসহ প্রত্যেকের জীবিত অথবা মৃত ধরার জন্য মাথাপিছু দশ হাজার টাকা করে পুরস্কার ঘোষনা দিয়েছিলেন। সবাই বিভিন্ন পোষাক ও চেহারা পাল্টেই আমাদের বাড়ীতে যাতায়াত করতেন। তখন মাঝে মধ্যেই এসকল নেতাদের উপস্থিতিতে আমাদের বাড়ীতে মিটিং হতো। আমি নিজে সকলকে রান্না করে খেতে দিতাম। সকলে আমাকে ভাবী সাহেবা বলেই সম্বোধন করতেন। ওনারা সকলেই সে সময়ে দেশের নামকরা কমিউনিস্ট নেতা ছিলেন, তাই তাদেরকে সেবা করতে পেরে আমারও ভালো লাগতো। তাদের রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিলো গরীব দুঃখীর দুই বেলা রুটি রুজির ব্যবস্থা করা। আমার স্বামী লুৎফর রহমান সরদার ১৯৭০ সালে কমিউনিষ্ট পার্টির পক্ষে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থেকে সংসদ নির্বাচন করেন। তিনি ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষনা আসে, তখন তার পার্টিও বঙ্গবন্ধুর ওই আহ্বানে একত্বতা ঘোষনা করে। সেজন্য পাকিস্থানী আর্মিরা আমার স্বামীকে টার্গেট করেন। সে সময়ে তিনি পালিয়ে ভারতের টাকিতে যেয়ে আশ্রয় নেন এবং জ্যোতিবসু ও তার দলের সাহায্যে টাকীতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প তৈরী করেন। তাদের খাবার অন্ন-বস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেন। তখন আমি খুলনা থেকে পায়ে হেটে আমার ছোট ছোট তিনটি সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়ী সখিপুরে আসি এবং তারপর ভারতের টাকীতে চলে যাই। আমাদের খুলনার বাড়ী পাকিস্থান হানাদার বাহিনীর সদস্যরা লুট করে নেয় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে ঢাকী ক্যাম্পের তত্ত্বাবধানে ১৯ নং সেক্টর প্রতিষ্ঠিত হয়। ৯ নং সেক্টর গঠনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন এম.এ গফুর সাহেব, ক্যাপ্টেন শাহাজাহান মাস্টার, ইপিআর সুবেদার আয়ুব হোসেন ও আমার স্বামী লুৎফর রহমান সরদার। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে আমার স্বামী কলকাতায় পিয়ে পার্টির কাছ থেকে অস্ত্র কম্বল ও খাদ্যনিয়ে আসেতেন এবং সেগুলো ৯ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ভাগ করে দিতেন। মাঝে মাঝে যখন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে খাবার না থাকতো, তখন আমি সেখানকার ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে আমার বাড়ীতে খেতে দিতাম। যুদ্ধকালীন সময়ে নিরপত্তার জন্য জ্যোতিবসুর ব্যক্তিগত পিঙ্গুলটিও আমার স্বামীকে দিয়ে দিয়েছিলেন। আমার পরিবার দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে আশানুরূপ তেমন কিছুই পাইনি। স্বাধীনতার পর প্রয়াত আওয়ামীলীগ নেতা আইভি রহমানের ভাই আজিজুর রহমান ভূইয়া (প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের শ্যালক) ও ততকালিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এল. আর সরকার আমার স্বামীকে এনিমি প্রোপার্টি দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি নেননি। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলে আমার স্বামী রাজনীতি থেকে সরে আসেন। দেবহাটার হাজী কেয়ামুদ্দীন মেমোরিয়াল মহিলা কলেজটি সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় গড়ে তোলেন। দক্ষিণ সখিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে টানা ১৭ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আমার ও আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে দুঃখের যে বিষয়টি সেটি হলো দেশের জন্য এতটা অবদান রাখা স্বত্ত্বেও স্বীকৃতি স্বরুপ তার নামটি তেমন কোথাও স্মরণ করতে দেখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার সামনেই পাকিস্থানী দালাল ইউনুসকে নিজের হাতে নৌকার মধ্যে গুলি করে হত্যা করেন আমার স্বামী। একবার পাটির গোপন কাগজ পত্র সহ আমার স্বামীকে পুলিশ আটক করে। তখন ভারতেশ্বরী হোমস্ এর হেনা দাস ওনাকে পুলিশের হাত থেকে মুক্তি করেন। দিনাজপুরের ইলা মিত্রের সাথে আমার স্বামীর ঘনিষ্টতা ছিল। ইলা মিত্রের অনেক দুঃখের কাহিনি আমি ওনার কাছ থেকে শুনেছি। পাকিস্থানী সৈন্যরা ও বিহারী রাজাকাররা তার উপর অনেক অত্যাচার করেছিল। বার্ধক্যের কারণে বর্তমানে আমি জীবনের শেষ দিকে পৌঁছে গেছি। বর্তমানে আমার শারিরীক অবস্থাও ভালো নয়। আমার শেষ ইচ্ছে যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অন্যন্য অবদানের জন্য আমার স্বামীকে একুশে পদকে সম্মানিত করা হোক। তাহলে অন্তত মৃত্যুর পরে হলেও তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে যথাযথ সম্মান পেয়েছেন মনে করব।

লেখক: কারিমুন নেছা, সহধর্মিনী-বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান সরদার, প্রয়াত ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।

সংবাদ টি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2020 All rights reserved
Design by: SHAMIR IT
themesba-lates1749691102
error: Content is protected !!