জাতীয়

সাগর-রুনি মামলা: টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর নাম

জাতীয় ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফলো করুন
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের মেসেঞ্জার

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই তদন্ত প্রতিবেদন আজ মঙ্গলবার আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘এ–সংক্রান্তে জিয়াউল আহসানের সহকারী একজন র‌্যাব সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে উল্লিখিত প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্তে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় বর্ণনা দেন। জোহার বক্তব্য সমর্থন করে পরবর্তী সময়ে আইসিটি ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের বক্তব্য প্রদান করেন। এই চিঠিটা আমি আপনাকে বলি যে আমরা আজকে যে হাইকোর্টের আদেশের ভিত্তিতে যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল সেই অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ কথাটি তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আজিজুল হক লিখেছেন।

বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চে এই প্রতিবেদন পেশ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাসের সময় মঞ্জুর করেছেন আদালত। মামলার ইতিহাসে এটি চতুর্থবারের মতো সময় বৃদ্ধির ঘটনা। পরবর্তী নির্দেশনার জন্য আদালত আগামী ২৯ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন। ওইদিন তদন্তসংশ্লিষ্টদের আদালতে সশরীরে উপস্থিত থেকে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করতে বলা হয়েছে। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো সময় পেল টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্স ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিষয়টির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সেদিন উপস্থিত হতে বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জানিয়েছেন। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন এবং এটির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন ২৯ এপ্রিল। শিশির মনির বলেন, আদালত বিবেচনা করে তাঁদের ছয় মাস সময় দিয়েছেন এবং ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখে পরবর্তী আদেশের জন্য আসবে। যেহেতু এটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সবচাইতে বেশি ইম্পর্টেন্স এখানেই থাকা উচিত। বললেই তো আর হবে না, এভিডেন্স সংগ্রহ করতে হবে।

তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে টাস্কফোর্স প্রায় ৯০ জন সাক্ষীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং ২৪ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করেছে। মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, গত ৩০ আগস্ট এনটিএমসির সাবেক পরিচালক জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসভবনে অভিযান চালিয়ে দুদক ডিজিটাল আলামত জব্দ করে। এর মধ্যে জিও লোকেশন, এসএমএস ও প্রায় ৩০০টি সিডি বা কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) রয়েছে। পরে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো। সেগুলোর মধ্যে বিভিন্ন রকম জিও লোকেশন, এসএমএস, সিডিআরের প্রিন্টেড ভার্সন পাওয়া যায়।’।

রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্যমতে, জব্দকৃত ৩০০ সিডির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯০টি মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট ২১০টি সিডি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন যে, প্রাথমিক তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও আলামত অনুযায়ী জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে প্রাপ্ত সব তথ্য পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে। তাঁরা বলেন, মিডিয়াতে তাঁদের তদন্তকাজ শেষ হলে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য তাঁরা পিবিআইয়ের তদন্তকারী দলের কাছে হস্তান্তর করবেন।’। তিনি বলেন, ‘তাঁদের কাছে কী আলামত আছে তা চেয়েছেন এবং তাঁরা একটা চিঠিও দিয়েছেন। আদালতের কাছে এই তদন্ত প্রতিবেদনের এই অংশটুকু পড়ে শুনিয়েছি।’। কারণ, যেসব সিডি আইসিটি তদন্তকারী প্রসিকিউশন টিম উদ্ধার করেছে, প্রায় ৩০০। সে আলোকে এগুলো অ্যাসেস করতে তাঁদের ৩০০টা সিডি, যার ৯০টা অ্যাসেস হয়েছে, আরও ২১০টা অ্যাসেসমেন্টের বাকি আছে, সেগুলো করতে তাঁরা সময় চেয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের ভেতরে অ্যাসেস করবেন এবং উপযুক্তভাবে, উপযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে উপযুক্ত যে এভিডেন্স পাবেন, এটা আদালতের সামনে উপস্থাপন করবেন—এটাই হবে তাঁদের প্রত্যাশা।

বাদীপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, মামলার তদন্তে রাষ্ট্রপক্ষ নতুন কিছু সূত্রের কথা উল্লেখ করেছে, যার সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর নাম জড়িয়েছে। তবে শুধু নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট নয়, এর স্বপক্ষে শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। আদালতে শিশির মনির যুক্তি দিয়েছিলেন যে, এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তে দীর্ঘ সময় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবুও আদালত সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের সময় দিয়েছেন।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি নৃশংসভাবে নিহত হন। ঘটনার সময় সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনে এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। ঘটনার পর রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় মামলাটি দায়ের করেছিলেন। দীর্ঘ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত এই চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত কিনারা হয়নি।

আদালতে শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী। বাদীপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং রিট আবেদনকারী পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ শুনানিতে অংশ নেন। আগামী ২৯ এপ্রিলের পরবর্তী শুনানিতে সিডি বিশ্লেষণ ও তদন্তের হালনাগাদ তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সময় চাওয়ার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আদালতের কাছে বলেছিলাম একটু লম্বা সময় দরকার। এখানে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হচ্ছে, এই মামলায় যাঁরা তদন্তকারী ব্যক্তি, যাঁরা আইসিটিতে আছেন, যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকবেন, ওই সময় তাঁকে আদালত বলেছেন যে তিনি যেন আদালতে এসে তদন্ত বিষয়ে আদালতকে অবহিত করেন।’। ফলশ্রুতিতে এখন যে ক্লুর কথা বলছেন রাষ্ট্রপক্ষ, তা যদি সিডি পর্যালোচনায় সঠিক বিবেচিত হয়, তাহলে আদালতের সামনে তাঁরা ২৯ এপ্রিল উপস্থাপন করবেন।’।