জাতীয় পার্টি

ট্রেনের শেষ বগিতেই ৩৫ বছরের জীবন সিরাজ মিয়ার

জাতীয় পার্টি ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফলো করুন
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের মেসেঞ্জার

সাত দশক পার করা সিরাজ মিয়ার জীবন যেন একটি চলন্ত ট্রেনের মতোই। যেখানে মানুষের শেষ বয়সে প্রয়োজন হয় প্রিয়জন আর নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের, সেখানে সিরাজ মিয়ার ঠিকানা গত ৩৫ বছর ধরে কেবলই রেললাইন। কোনো গন্তব্য নেই, নেই কোনো স্থায়ী পরিচয়—ট্রেনই এখন তার ঘরবাড়ি এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার একমাত্র বাহন। সামান্য অসতর্কতা কিংবা হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ। তার কথায় কোনো অভিযোগ নেই, নেই কারও প্রতি আক্ষেপও। ট্রেনই তার পথ, স্টেশনই তার বিরতি, আর মানুষের সহায়তাই তার জীবনের অবলম্বন।

তার আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর গ্রামে। জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময়, প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি ট্রেনের শেষ বগির পেছনে ঝুলে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় পাড়ি দিচ্ছেন। সম্প্রতি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে দেখা মেলে তার। জনাকীর্ণ ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের ব্যস্ততার ভিড়ে তিনি বরাবরের মতোই ট্রেনের একদম শেষ প্রান্তে, যেখানে বাতাসের ঝাপটা আর ট্রেনের ঝাঁকুনিই সঙ্গী। কিন্তু এই চেনা দৃশ্যের বাইরে ট্রেনের একেবারে শেষ প্রান্তে রয়েছে আরেকটি অচেনা গল্প। ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। তবে সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি ট্রেনের শেষ বগীর পেছনে বসে যাতায়াত করছেন। তার জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে অনেক প্রশ্নের জন্ম নেয়। চারপাশে যাত্রীদের ছোটাছুটি, হুইসেলের শব্দ, রেললাইনে ট্রেনের চাকার ঝাঁকুনি-সবকিছুর মাঝেও তিনি ছিলেন নির্বিকার।

সিরাজ মিয়ার জীবনের কিছু বিশেষ তথ্য

  • বয়স: প্রায় ৭০ বছর।
  • যাযাবর জীবনকাল: ৩৫ বছর ধরে ট্রেনের শেষ বগিতে অবস্থান।
  • আয়ের উৎস: সাধারণ মানুষের কাছে আর্থিক সহায়তা।
  • জীবনদর্শন: কোনো অভিযোগ বা আক্ষেপহীন স্বাধীন পথচলা।

তার জীবনের এই অদ্ভুত অভ্যাসের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সিরাজ মিয়া বলেন, “টাকার জন্য নয়, অভ্যাস হয়ে গেছে। এভাবেই চলি।” এটি এখন তার দীর্ঘদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি বা কোনো বিশেষ ঘটনার প্রয়োজনে হয়তো একসময় এভাবে চড়তে শুরু করেছিলেন, কিন্তু সেই অভ্যাস এখন তার জীবনের একমাত্র রুটিন। একসময় হয়ত পরিস্থিতির কারণে এমনভাবে ট্রেনে উঠেছিলেন। সেই সঙ্গে বদলে যায় তার চারপাশের দৃশ্যপটও। আবার কখনও হয়ত দিনের পর দিন কষ্ট করেই কাটাতে হয়। তার জীবনের গল্পে বড় কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসাব নেই।

ট্রেনের শেষ বগির পেছনে বসে থাকা যে চরম ঝুঁকিপূর্ণ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বয়সের ভারে ন্যুব্জ সিরাজ মিয়া নিজেও জানেন বিষয়টি। এ বিষয়ে সতর্ক করা হলে তিনি অকপটে বলেন, “কিছু করার নেই। স্বাধীনভাবে যাতায়াতের জন্য এভাবেই চলি।” কোনো নিয়মকানুন বা গণ্ডির মধ্যে না থেকে নিজের মতো করে বেঁচে থাকাটকেই তিনি স্বাধীনতা মনে করেন। তার ভাষায়, ঝুঁকি আছে, তা তিনি জানেন।

হবিগঞ্জ থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তে তার আসা-যাওয়া। যেখানেই ট্রেন থামে, মানুষের কাছে সহযোগিতা চেয়ে নিজের খাবার ও প্রয়োজনীয় খরচ মেটান তিনি। কখনো অপরিচিত কারো সহায়তা মেলে, আবার কখনো দীর্ঘ পথ চলতে হয় চরম কষ্টে। ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের কোলাহল আর রেললাইনের চাকার ছন্দের মধ্যেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন তার আপন ভুবন। মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ ||। কখনো শহর পেরিয়ে, কখনো গ্রামের বুক চিরে, কখনো সবুজ মাঠের পাশ দিয়ে। ট্রেনের ভেতরে তখন নানা বয়সী মানুষের ব্যস্ততা-কেউ কর্মস্থলে ছুটছেন, কেউ বাড়ি ফিরছেন, কেউবা যাচ্ছেন প্রিয়জনের কাছে। কেউ সাহায্য করলে তা দিয়ে খাবারসহ প্রয়োজনীয় খরচ চালান। কোথাও পরিচিত মানুষ মেলে, কোথাও অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা পান।

বয়সের ছাপ স্পষ্ট তার শরীরে, চুলে পাক ধরেছে অনেক আগেই।

তবুও বদলায়নি তার জীবনযাত্রার ধরন।

কেউ যদি তাকে জিজ্ঞাসা করে কেন তিনি এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলেন, তার উত্তর পাওয়া যায় না।

তিনি শুধু জানেন ট্রেন চলবে, আর তার সঙ্গী হবে এই অন্তহীন ভ্রমণ। শায়েস্তাগঞ্জ জংশন থেকে ট্রেনটি আবার যখন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়, সিরাজ মিয়া তখনো আগের মতোই শেষ বগির পেছনে নির্বিকার বসে থাকেন। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও তার এই অজানা গন্তব্যে ছুটে চলা যেন এক রূঢ় বাস্তবতা। কাছে গিয়ে কথা বলতেই বেরিয়ে আসে তার জীবনের নানা অজানা অধ্যায়।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • ৭০ বছর বয়সে যেখানে একজন মানুষের প্রয়োজন হয় নিরাপদ আশ্রয়, পরিবারের সান্নিধ্য ও একটু নিশ্চিন্ত জীবন-সেখানে সিরাজ মিয়ার জীবন এখনও রেললাইনের সঙ্গে বাঁধা।