ছোটবেলা থেকেই ক্লাসে প্রথম হওয়া রাকিবুল ইসলামের স্বপ্ন ছিল আইন বিভাগে পড়াশোনা করার। এইচএসসি পরীক্ষা শেষে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের দাদিরআটা গ্রামের কৃষক খাদেমুল ইসলাম ও জোহুরা বেগমের এই সন্তান ভর্তি হন ঢাকার ফার্মগেটের একটি ভর্তি কোচিংয়ে। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই নীলফামারীর ডিমলা থেকে উদ্ধার করতে হয় তাঁর নিথর দেহ। ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে দেওয়া পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তবে এই সাফল্য পরিবারটির কাছে আনন্দের বদলে আরও গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকার ফার্মগেট এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার মানুষও মেনে নিতে পারছেন না মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন পরিণতি। রাকিবুল ইসলামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদিরআটা গ্রামে। এতে পরিবারের সদস্যদের শোক আরও বেড়ে গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকার পূর্ব শেওড়াপাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে মেসে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রাকিবুল। ওই দিন বিকেল চারটার দিকে অচেনা একটি নম্বর থেকে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে কল আসে। কোচিংয়ের শিট সংগ্রহের কথা জানিয়ে তাঁকে ডাকা হলে রাকিবুল দুই বন্ধু ইসমাইল ও বুলবুলকে বিষয়টি বলে বাইরে বের হন। কিন্তু এরপর আর তিনি মেসে ফিরে আসেননি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর কোচিংয়ের শিট দেওয়ার কথা বলে এক লোক তাঁকে বাসা থেকে ডেকে নেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় একজন তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করেন।
ওই দিন রাত ১২টা ২৩ মিনিটে বড় ভাই জহিরুল ইসলাম রাকিবুলের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে অচেনা এক ব্যক্তি ফোন ধরে রাকিবুলকে ছেড়ে দিতে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরবর্তীতে ফোন বন্ধ করে দিয়ে আরও টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে পরিবার চার লাখ টাকা পাঠালেও অপরাধীরা রাকিবুলকে ফেরত না দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
নিখোঁজের ঘটনায় ৫ অক্টোবর রাকিবুলের ভাই জহিরুল ইসলাম কাফরুল থানায় একটি অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন। পুলিশ একই দিন সন্ধ্যায় ঢাকার শুক্রাবাদ এলাকা থেকে অভিযুক্ত আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানান, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডির এক বাসায় নিয়ে রাকিবুলকে হত্যা করা হয়। পরে কসটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে মরদেহ একটি কার্টনে ভরে রাখা হয়।
মামুন আরও জানান, ওই দিন রাত ১০টার দিকে অটোরিকশায় কার্টন নিয়ে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে যান এবং বাসে চড়ে রংপুরে পৌঁছান। সেখান থেকে নীলফামারীর ডিমলা বাসস্ট্যান্ডে নেমে পরদিন সকাল ১০টার দিকে কার্টনটি নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। সারা দিন সুপারিবাগানে রাখার পর সন্ধ্যার দিকে তা মাটিতে চাপা দেওয়া হয়। ৬ অক্টোবর মামুনের দেখানো ডিমলার বালাপাড়া গ্রামের সুপারিবাগান থেকে কসটেপে মোড়ানো কার্টনের ভেতর থেকে রাকিবুলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কাফরুল থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল কুমার হালদার জানান, আসামি মামুনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গ্রহণ করার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সারা দিন বাড়ির পাশের সুপারিবাগানে সেটি রেখে সন্ধ্যার পর মাটি চাপা দেন।
পরীক্ষার ফলাফলে কৃতিত্বের খবর আসার পর শোকের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠেছে রাকিবুলের পরিবারে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভাই জহিরুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ছোট ভাই এত ভালো ফল করার পরেও তাঁদের অঝোরে কাঁদতে হচ্ছে। এমন আনন্দের সময়ে সহপাঠী, শিক্ষক ও স্বজনদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের কথা থাকলেও পুরো গ্রামজুড়ে এখন শুধুই শোকের ছায়া।










