বিশ্ব

ইউরোপজুড়ে তরুণদের ব্যাপক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তার শত শত

বিশ্ব ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফলো করুন
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের মেসেঞ্জার

জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়, শিক্ষাক্ষেত্রে সংকট, সরকারি খরচ কাটছাঁট এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউরোপজুড়ে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে তরুণদের ক্ষোভ। হ্যালোইন উদ্যাপনের রাতে ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড ও ইতালিতে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা, ব্যাপক সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী প্যারিস থেকে বার্লিন কিংবা ওয়ারশ—একাধিক শহরের রাজপথ রাতারাতি রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। ওই দিন দেশজুড়ে বিভিন্ন দোকান, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। সেই সঙ্গে তরুণদের স্বার্থ ও উদ্বেগের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে রাজনীতিকেরা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের।

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোসহ একাধিক দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদ মিছিলের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘাত ঘটে। স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে দেশজুড়ে ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন চারজন পুলিশ সদস্য। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল দেশজুড়ে অন্তত ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ এই প্রতিবাদে শামিল হন। তবে রাত বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। কারণ, এখন দেশ পরিচালনা করছে একদল অযোগ্য মানুষ। এক বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, সেখানে ‘সহিংস দাঙ্গা’ হয়েছে।

প্যারিসে দিনের বেলায় শান্তিপূর্ণ মিছিল হলেও শেষের দিকে পুলিশ অবস্থান নিলে ছড়িয়ে পড়ে বিশৃঙ্খলা। জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে প্যারিসসহ লিওঁ ও তুলুজ শহরে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। মার্সেই শহরের কিছু স্থানে সংঘাত দেখা গেলেও রাতের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। দেশটিতে গত ১৭ অক্টোবরের সহিংসতা ও লুটপাটের পর এটি ছিল টানা তৃতীয় সপ্তাহের প্রতিবাদ কর্মসূচি, যদিও আগের দুই সপ্তাহের তুলনায় উপস্থিতির সংখ্যা কিছুটা কম লক্ষ্য করা গেছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলগুলোর বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ ছিল। এএফপির এক সাংবাদিক জানান, ওই সময় পুলিশের ভ্যান ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সদস্যরা সড়কটিতে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না।

ফ্রান্সের বর্তমান কঠোর অবস্থান প্রকাশ করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সতর্ক করে জানান, যাঁরা শনিবার রাতে সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে শক্ত জবাব দিতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে প্যারিসের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জেরোম রদ্রিগেজ নামে এক ব্যক্তি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং সরকার সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট বাদ দিয়ে হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কয়েক সেন্টের সংকটে ভুগছে। তারা কোটি কোটি ইউরোর হিসাব-নিকাশ করছে, অথচ সাধারণ পরিবারগুলো সামান্য কয়েক সেন্টের জন্য হিমশিম খাচ্ছে।’।

এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মূলত ফরাসি শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী চাপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিতর্কিত নিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে। পরবর্তীতে শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবি নিয়ে তরুণদের সাথে কাঁধে কাঁধ মেলায়। মাখোঁ সরকারের এমন এক মুহূর্তে এই চাপ এল, যখন আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ‘ফিচ’ ফ্রান্সের ঋণের ভবিষ্যৎ আউটলুক ‘নেতিবাচক’ বলে চিহ্নিত করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে দেশটির জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে সরকারি ঋণ, ফলে সরকারের ব্যয় কমানো ছাড়া উপায় থাকছে না। ফ্রান্সের সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

এদিকে জার্মানিতেও বিক্ষোভে তীব্র উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। ‘জেনজি রেগেল্ট!’ নামের তরুণদের একটি সংগঠনের ডাকে বিভিন্ন শহরে ১০ হাজারের বেশি আন্দোলনকারী রাজপথে নামেন। মূল দাবি ছিল, নীতি নির্ধারণে তরুণ সমাজের উদ্বেগ ও চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিলে ফ্রাঙ্কফুর্টের মতো শহরে মুখোশধারীরা দোকানপাটে লুটপাট চালায়। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ–সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ৫ শতাধিক। জার্মানিজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বে চলা বড় ধরনের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর এ ঘটনা ঘটল।

ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল, আতশবাজি এবং পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে জলকামান ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করা হয়, যাতে এক পুলিশ সদস্য আহত হন। শহরটির বাণিজ্য অঞ্চলের প্রধান সড়কের বিশাল অংশ সিলগালা করে দেয় কর্তৃপক্ষ। আকাশে হেলিকপ্টার টহল দিতে দেখা যায় এবং এলাকাটিতে ঘন ঘন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সড়কে থেমে থেমে বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যাচ্ছিল।

জার্মানির হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রোমান পোসেক উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, ফ্রাঙ্কফুর্টের কর্মসূচিতে অন্তত ১০০ জন উগ্র বামপন্থী অনুপ্রবেশ করে চরম বিশৃঙ্খলা ঘটিয়েছে এবং যেভাবে এই প্রতিবাদ শেষ হয়েছে তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এছাড়া বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গ শহরেও সংঘর্ষ বাধে। আন্দোলনকারীরা পুলিশের দিকে ডিম ও বোতল ছোড়ে, অন্যদিকে হামবুর্গ ও কোলনে পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে হয়। বন শহরে সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

হ্যালোইনের রাতের এই আন্দোলনে অনেকে ডাইনোসর ও ব্যাটম্যানের রূপ নিয়ে আসেন এবং তাঁদের হাতে ছিল ‘প্রতিরোধের সময় এখন’ ও চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে নির্দেশ করে ‘মের্ৎসকে বিদায় নিতে হবে’ লেখা ব্যানার। বার্লিনে অংশ নেওয়া ২০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী উল্লেখ করেন, ফ্রান্সসহ গোটা ইউরোপের বর্তমান জনদাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। হ্যালোইনের সঙ্গে বিক্ষোভের দিন মিলে যাওয়ায় অনেকেই বিচিত্র পোশাক পরে এসেছিলেন।

পোল্যান্ডেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের ইউরোপপন্থী সরকার দাবি করেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফেরাতেই বিচারালয়ের প্রধানকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া আবশ্যক ছিল। তবে বিরোধী পক্ষ একে এক ধরনের ‘অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দ্বিতীয় রাতের মতো রাস্তায় নামেন শত শত প্রতিবাদকারী। বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ইউরোপ, দেশে দেশে জেন–জিরা কেন ফুঁসে উঠেছে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের হাতে বিকল্প কমে আসছে। তবে বিরোধীপক্ষের সমালোচকেরা সরকারের এ পদক্ষেপকে ‘অভ্যুত্থান’ বলেছেন। ইতালিজুড়ে ধর্মঘট, রাস্তায় হাজারো মানুষ। সিএনএনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক গতকাল বলেছেন, দেশের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে তাঁর সরকার।

ঘটনার সময় সেনেগাল সফরে রওনা হওয়া প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি মাঝপথ থেকে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফিরে আসেন। তিনি নিজে সাংবিধানিক আদালত ভবনে গিয়ে বরখাস্ত হওয়া ট্রাইব্যুনাল প্রধানকে ভবনের ভেতরে প্রবেশে সহায়তা করার কথা জানান। শুক্রবার রাতে পুলিশ তিন বিক্ষোভকারীকে আটক করে। সে সময় আন্দোলনকারীরা বেড়া ভেঙে আদালতের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে নানা বস্তু ছুড়ে মারেন।

একই সাথে আন্দোলন ছড়িয়েছে ইতালিতেও। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া খরচ কমানো, শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো এবং সরকারি সেবা নিশ্চিতের দাবিতে রাজপথে নামেন হাজার হাজার মানুষ। এসবের পাশাপাশি সামরিক খাতে ইতালি সরকারের অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের বিরুদ্ধেও গর্জে ওঠেন বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী ও শ্রমিকেরা।