
সারাদেশের কোটা আন্দোলনের সফলতায় স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বস্থরের জনতা আনন্দ আর ক্ষোভে ফেটে পড়েছে দেবহাটায়। গত সোমবার দুপুরের পর থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেকে বিভিন্ন এলাকায় ছোট বড় আনন্দ মিছিল করেছে শিক্ষার্থী সহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ। একদিকে আনন্দ মিছিলে মিশে মনের আনন্দ প্রকাশ করছেন স্বাধীন দেশের নাগরিকরা। টানা ২দিনে বাধাহীন মুক্ত পাখির মত ডানা মেলে মত প্রকাশ করে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে।
ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ: তীব্র আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর সর্বস্থরের ছাত্র, বিএনপি, জামায়াত-শিবির, সাধরণ মানুষ মিষ্টি বিতরণ করে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জুলুম নির্যাতনের চাপা ক্ষোভে বিষ্ফোরিত হয়ে ওঠে দেশের মানুষ। তার প্রেক্ষিতে উত্তেজিত জনতা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যানবহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। যার মধ্যে কুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আছাদুল হকের বাসভবন, কুলিয়ার ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেনের দলীয় কার্যালয়, কুলিয়া গ্রাম ডাক্তার মনিরুজ্জামনের চেম্বার, কুলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়, সখিপুর মোড়স্থ বঙ্গবন্ধু মুর্যাল, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক শেখ ফারুক হোসেন রতনের বাসভবন, মার্কেট, ব্যবহৃত মোটারসাইকেল ও প্রাইভেটকার, ইউপি সদস্য নির্মল মন্ডলের বসতবাড়ি, বেসরকারি সংস্থা আশার আলোর প্রকল্প অফিস, সখিপুরের মোনাজাত আলীর বসতবাড়ি, ঈদগা বাজারের রফিকুল ইসলামের জুতার দোকান, প্রভাষক শেখ শরিফুল ইসলাম পলাশের মা এন্টারপ্রাইজ, মাঘরী গ্রামের ঘোষপাড়ার বিশ্বজিৎ ঘোষের বসতবাড়ি, নওয়াপাড়া ইউনিয়নে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবর রহমানের দলীয় কার্যালয়, ইউপি চেয়ারম্যান সাহেব আলীর কার্যালয়, দেবহাটা সদরে জেলা পরিষদ সদস্য ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের কার্যালয় সহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে ক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষ। এছাড়া কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা এমজেএফ বিশেষ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ভবনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করা হয়। এসময় সেনা বাহিনী টিমকে খবর দেওয়া হলে এবং স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে দুবৃত্তরা পালিয়ে যায়। এতে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা দেওয়া বিদ্যালয়টি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থত হয়।
এছাড়া সোমবার রাতে জেলা পরিষদ সদস্য নজরুল ইসলামকে পিটিয়ে জখম করে দুবৃত্তরা। পরে গুরুত্বর অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার সময় সখিপুর মোড়ে একদল তাকে আবারো পিটুনি দেয়। এসময় তাকে মৃত ভেঙে ফেলে দিলে পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে।
আনন্দ মিছিল: শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া, সখিপুর, পারুলিয়া, নওয়াপাড়া, দেবহাটা সদর থেকে মিছিল বের হয়। জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াত ইসলাম, যুবদল, ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র শিবির সহ সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। অপরদিকে মঙ্গলবার বিকালে পারুলিয়া বাসস্টান্ড থেকে আনন্দ মিছিল বের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন “দরদী।” এসময় বিভিন্ন শ্লোগানে মুখোরিত হয়ে ওঠে দেবহাটার আকাশ-বাতাশ। শ্লোগানে শ্লোগানে কম্পিত হয় গোটা এলাকা। আনন্দ মিছিলে যোগদেয় সর্বস্থরের নারী, পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধা। পরে বিভিন্ন এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়। মঙ্গলবার উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম সম্পাদক হাবিবুর রহমান মন্টু’র দেবহাটার বিভিন্ন প্রান্তে শোডাউন শেষে উপজেলা সদরে পথসভা করা হয়। এসময় হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, হিংসামূলক সকল কর্মকান্ড পরিহার করে দেশের সম্পদ রক্ষায় এক সাথে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আসিফের পরিবারে “দরদী”: কোটাবিরোধী আন্দোলনে শহীদ আস্কারপুর গ্রামের আসিফ হাসান এর কবর জিয়ারত ও তাঁর পরিবারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দেবহাটা উপজেলার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন দরদির সদস্যবৃন্দ। মঙ্গলবার (৬ই আগস্ট) দরদির পক্ষ থেকে শহীদ আসিফ হাসান এর কবর জিয়ারত ও তাঁর পরিবারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দরদির প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আল মামুন, প্রতিষ্ঠাতাকালীন কমিটির সভাপতি নাসিম হাসান, দরদির বর্তমান সভাপতি সাকিব হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জিএম আবু রাহাত এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দেবহাটা উপজেলার সমন্বয়ক মো: আবিদ হাসান তানভীর। এসময় দরদির উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি বিষয়ক উপদেষ্টা হাফেজ নাসির উদ্দীন কবর জিয়ারত ও দোয়া-মোনাজাত পরিচালনা করেন। পুনরায় দরদির সদস্যরা পারুলিয়াতে এক বর্ণাট্য বিজয় র্যালি পরিচালনা করেন এবং পরবর্তীকালে দরদির নেতাকর্মীরা বক্তব্য রাখেন। বিজয় র্যালি পরবর্তী পারুলিয়া বাসস্ট্যান্ডে শহীদ আসিফ হাসানের স্মরণে একটি অস্থায়ী “শহীদ বেদি” নির্মাণ করেন দরদী সংগঠন।
গায়েবী জানাযা: সারাদেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের হামলায় নিরস্থ শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ, শিশুর মৃত্যুতে শহীদদের স্মরণে গায়েবী জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার উপজেলার সরকারি খান বাহাদুর আহছান উল্লা কলেজ মাঠে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলাম দেবহাটা শাখার আয়োজনে হাজার হাজার মানুষের অংশ গ্রহণে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিতে হাজির হয়। এসময় ছাত্রশিবিরের উত্তর শাখার সভাপতি রোকনুজ্জামানের পরিচালনায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্য বক্তব্য দেন সখিপুর আলিম মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আরিফ বিল্লাহ, সাবেক সখিপুর ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মঈনউদ্দীন ময়না, হাফেজ কারী ফজলুল হক আমিনী, দেবহাটা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আব্দুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, দক্ষিণ শাখার সভাপতি সহ বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন পর্যয়ের নেতৃবৃন্দরা।
সার্বিক বিষয় নিয়ে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা ওলিউর রহমান জানান, বিজয়ের আনন্দে জানমালের ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোন হিন্দু বা অন্য ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। দুএকটি ব্যক্তি শত্রæতার জেরে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কথা শোনা গেলেও সেটি খুবই সামান্য। হিন্দুদের মন্দির, থানা ভবন সহ সরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনী বসানো হয়েছে। আমরা দেশ ও জনসাধারণের জন্য আন্তরিক। কোন ধরণের তথ্য পেলে আমাদের জানান, আমরা সর্বচ্চো নিরাপত্তা দিয়ে দেশ রক্ষায় কাজ করবো।