
সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ দুই ফরেস্ট স্টেশন- কৈখালী ও কদমতলায় দায়িত্ব পালন করা বন কর্মকর্তা শ্যামা প্রসাদ রায়ের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত রাজস্বের বাইরে কৌশলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, পাস-পারমিট বন্ধ থাকার সময়েও নৌকা সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া এবং অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ-কাঁকড়া আহরণের ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় জেলে ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে- বছরের পর বছর সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলেদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে জেলেদের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় নিয়মবহির্ভূতভাবে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তা শ্যামা প্রসাদ রায়।
প্রতি বছরের মতো চলতি বছরও ১ জুলাই থেকে সুন্দরবনের জেলেদের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলেদের অভিযোগ, বিএলসিতে সরকারি রাজস্ব ও ভ্যাট বাবদ যে অর্থ উল্লেখ রয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। টোকেনে লেখা ভ্যাঁট সহ ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। অথচ নেয়া হয়- ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
কৈখালী ও কদমতলা স্টেশনের আওতাধীন একাধিক জেলের অভিযোগ, বিএলসি নবায়নের সময় নৌকাপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, এই অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশের কোনো সরকারি রসিদ দেওয়া হয় না।
একাধিক জেলে বলেন, ‘সুন্দরবনে বছরের একটি বড় সময় মাছ ধরা বন্ধ থাকে। বর্তমানে জুন, জুলাই ও আগস্ট- এই তিন মাস পাস-পারমিট বন্ধ। এর মধ্যে জলদস্যু ও অন্যান্য ঝুঁকি রয়েছে। তার ওপর বিএলসি নবায়নেও অতিরিক্ত টাকা দিতে হলে আমাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না।’ তাদের প্রশ্ন, সরকারি ফি নির্ধারিত থাকার পরও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে সেই অর্থ যাচ্ছে কোথায়?
অনুসন্ধানে আরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। সুন্দরবনে পাস-পারমিট বন্ধ থাকার সময়ও কথিত চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন নৌকাকে বনে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরাসরি নয়, দালালদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, কৈখালী ও কদমতলা স্টেশনের আওতাধীন সাতটি টহল ফাঁড়ি ও বিভিন্ন এলাকায় মাছ ও কাঁকড়া আহরণে নৌকাপ্রতি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সাত দিনের একটি ‘গোন’ বা মেয়াদে কাঁকড়ার নৌকা থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা, সাদা মাছের নৌকা থেকে ৪ হাজার টাকা, চিংড়ি মাছের নৌকা থেকে ৩ হাজার টাকা এবং জোয়ারে গিয়ে ভাটিতে ফিরে আসা ‘ডেলি পাট’-এর নৌকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অর্থ আদায়ের বিষয়ে কোনো সরকারি রসিদ বা অনুমোদিত ফি কাঠামোর তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। কৈখালী ও কদমতলা স্টেশনের আওতাধীন নটাবেকি, হলদেবুনিয়া ও কাঁছিকাটাসহ তিনটি অভয়ারণ্য এলাকায়ও কথিতভাবে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকায় নৌকা প্রবেশ ও মাছ-কাঁকড়া আহরণের পর ‘স্পেশাল টহল টিম’-এর নামে নৌকাপ্রতি আরও প্রায় ২ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন- সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ও কাঁকড়া আহরণ যদি নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে নৌকা প্রবেশের সুযোগই বা কীভাবে তৈরি হচ্ছে? আর ‘বিশেষ টহল’-এর নামে অর্থ আদায় হয়ে থাকলে তার হিসাবই বা কোথায়?
শ্যামা প্রসাদ রায়ের বিরুদ্ধে এর আগেও সুন্দরবনে দায়িত্ব পালনকালে নানা অভিযোগ ওঠার কথা জানা গেছে। প্রকাশ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পশ্চিম সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনে কর্মরত থাকার সময় তার বিরুদ্ধে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারে সহযোগিতা, বিএলসি নবায়নে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ, জেলেদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও মারধরের মতো অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে কয়রার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একাধিক চাঁদাবাজির মামলা হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন স্বাক্ষরিত এক পত্রে তাকে পাটকোস্টা টহল ফাঁড়িতে বদলি করা হয় বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, অতীতে বিতর্ক ও অভিযোগের মুখে পড়া একজন বন কর্মকর্তা বর্তমানে সাতক্ষীরা রেঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ কৈখালী ও কদমতলা- দুটি ফরেস্ট স্টেশনের দায়িত্ব একসঙ্গে কীভাবে পালন করছেন?
সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত করা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা দরকার।
কারণ সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এলাকায় বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, জেলেদের জীবিকা এবং সরকারি রাজস্বসবকিছুই জড়িত।
সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ দুই ফরেস্ট স্টেশন- কৈখালী ও কদমতলায় দায়িত্ব পালন করা বন কর্মকর্তা শ্যামা প্রসাদ রায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন- আমাকে কৈখালী স্টেশনের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ দুই স্টেশনে সরকার নির্ধারিত রেভিনিউয়ের বাইরে একটি টাকাও নেয়া হয়না। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তা ষড়যন্ত্রমূলক। আমি এর প্রতিবাদ জানাই।
নটাবেকি, হলদেবুনিয়া ও কাঁছিকাটাসহ তিনটি অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ দিয়ে ‘স্পেশাল টহল টিম’-এর নামে নৌকাপ্রতি ২ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন- ওই এলাকা আমার না। তারা নিতে পারে। তবে কারা নেয় জানা নেই। অথচ পরক্ষণেই অপর প্রশ্নের জবাবে শ্যামা প্রসাদ রায় বলেন- নটাবেকি এলাকা কদমতলার আওতাধীন। আমি কদমতলার অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি।
সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, আমি স্টেশন অফিসারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছি। এরপর তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিএফ ইমরান আহমেদের সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সুন্দরবনে পাস-পারমিট বন্ধ থাকার সময়ে নৌকা প্রবেশ, অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ-কাঁকড়া আহরণ এবং সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ- সবগুলোই গুরুতর। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।