সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কলিমাখালী গ্রামের ফারজানা আক্তার সংসারের অভাব জয় করতে লড়াই করছেন প্রতিদিন। তিনি নিজে সেলাই কাজ করে মাসে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করেন। অন্যদিকে তার স্বামীর মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকা। এই সামান্য আয়ে চারজনের সংসারের ব্যয় মেটানো দায় হয়ে পড়ে। প্রায়ই তাদের ধারদেনা করতে হয়। কিছুদিন আগেও ছোট ননদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়েছে এবং একটি খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারের দুটি ছাগল পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। তাঁদের বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ইউনিয়নের কলিমাখালী গ্রামে। কত টাকায় কাপড় কিনতে হবে, সেলাই করে কত আয় হবে, সেই টাকা দিয়ে কোন খরচ মেটাবেন—এসব ভাবনা ঘুরেফিরে আসে তাঁর দৈনন্দিন জীবনে। ফারজানা বলেন, ‘বড্ড আফসোস হয়, পড়াশোনাটা যদি করতি পারতাম।
বয়স চল্লিশের কোঠায় পৌঁছা ফারজানার জীবনজুড়ে রয়েছে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারার তীব্র আক্ষেপ। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি স্থানীয় লুৎফর মাস্টারের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ শুরু করেন, যা সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার পর পড়াশোনার অধ্যায়টি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। নিজের অপূর্ণতাকে সঙ্গী করে সন্তানদের শিক্ষাজীবন যেন কোনোভাবেই থমকে না যায়, সে লক্ষ্যেই তিনি স্বপ্ন দেখেন। এ প্লাস পাইছে শুনে আশপাশের মানুষও আমার বাড়িতে আইসে মেয়েডারে আদর করিছে। যত কষ্টই হোক, মেয়েডারে লেখাপড়া শিখাতি চাই।’। ছোটবেলায় অভাবের কারণে তাঁর পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। আমার মেয়েটা বলে, ওর চাইতে নাকি আমার মাথার ব্রেন ভালো।
গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে স্থানীয় লুৎফর মাস্টারের দেওয়া একটি ঘরে ফারজানা তার সেলাই মেশিনটি বসিয়েছেন। ভাঙা মাটির দেয়ালের ওই ঘরেই একদিকে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় হাঁড়ি-পাতিল ও কাপড়চোপড়, অন্যদিকে এক কোণে ছেলেমেয়ের বইয়ের স্তূপ। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি সন্তানদের আগ্রহই তাকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়। বর্তমানে তার ছেলে তামিম নবম শ্রেণিতে পড়ছে। মেয়ে আয়েশা এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। এখন সে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে। ফারজানাদের বাড়ির মাটির দেয়ালের কোথাও কোথাও ভেঙে গেছে। ঘরের ভেতরে বিছানা, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়চোপড়—সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অল্প জায়গার মধ্যে রাখা। ফারজানাদের ঘরের অবস্থা খারাপ দেখে তিনি নতুন ঘরটি সাময়িকভাবে ব্যবহার করতে দিয়েছেন।
মেয়ের ফলাফলের কথা বলতে গিয়ে ফারজানার চোখেমুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। তিনি জানান, জীবনে সবচেয়ে বড় আনন্দের মুহূর্ত ছিল মেয়ের সাফল্যের খবরটি পাওয়ার দিন। কষ্টার্জিত সংসার হলেও সন্তানদের সাফল্যে তিনি আনন্দিত। ফারজানা আরও জানান, ছোটবেলায় অভাব আর দুর্যোগ তাকে পরিবার থেকে আলাদা করেছিল। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ এক দুর্যোগে প্রায় দুই মাস বয়সে মায়ের মৃত্যুর পর মামাদের আশ্রয়ে বড় হন তিনি। সেই অনিশ্চিত শৈশব পেরিয়ে আসা ফারজানা এখন তার সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের উপার্জনের পথ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘জীবনের সবচেয়ে আনন্দ হইছে মেয়েডার রেজাল্ট যখন জানতি পারিছি সেদিন। মেয়ের এই সাফল্য ফারজানার নিজের জীবনের অপূর্ণতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বর্তমানে চোখের সমস্যার কারণে সেলাইয়ের কাজে সূক্ষ্ম কাজ করতে গিয়েও বেগ পেতে হয় ফারজানাকে।
সুইয়ে সুতা পরানো কঠিন হয়ে পড়লেও তিনি দমে যাননি। পরিবারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায়ই তাদের মৌলিক প্রয়োজনে কাটছাঁট করতে হয়, যার বড় প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন খাবারে। মাসিক ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা আয়ের সিংহভাগই চলে যায় খাবারের পেছনে। তবুও ফারজানার চাওয়া একটাই—তার সন্তানেরা যেন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তিনি নিজে পড়াশোনা না করতে পারলেও ছেলেমেয়ের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো জ্ঞান তার রয়েছে, যা থেকে তিনি অনুভব করেন যে তার ব্রেন মেধাবী ছিল, কেবল সুযোগের অভাবে তা পূর্ণতা পায়নি। ও বানান ভুল করলি আমি ধরিয়ে দিতি পারি।










