বিশেষ ও ফিচার

এইচএসসিতে বড় বিপর্যয়: শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকট ও করণীয়

বিশেষ ও ফিচার ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফলো করুন
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের মেসেঞ্জার

শিক্ষার্থী জীবনের মূল ব্রত হলো অধ্যয়ন বা জ্ঞান চর্চা। সংসার বা দৈনন্দিন নানা জটিলতা থেকে মুক্ত থেকে এই সময়ে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ জীবনের শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। কিন্তু ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে যে ভয়াবহ ধস নেমেছে, তা দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই এক বড় অশনিসংকেত। গত ২২ বছরের মধ্যে ফলাফলের এই নজিরবিহীন অবনতি সবাইকে গভীরভাবে বাকরুদ্ধ ও শঙ্কিত করে তুলেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে লেখাপড়ায়, যার সুস্পষ্ট প্রমাণ ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। এইচএসসি পরীক্ষা: ফেল করা মানেই জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া নয়।

দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে শিক্ষার মান ক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমে মাত্র ৩৫ হাজারে নেমে এসেছে, যেখানে গত বছরও এই সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার। এছাড়া শতভাগ পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন অস্বাভাবিক কমেছে, তেমনি একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের তালিকাও দীর্ঘ হয়েছে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন এ ধরনের ঘটনা ভাবনারও অতীত ছিল।

এবারের পরীক্ষায় মোট প্রায় সাড়ে ১০ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করতে পেরেছেন মাত্র ৫ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী। যার সহজ অর্থ হলো, প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জনে এই বিপুলসংখ্যকের ব্যর্থতা তাদের শিক্ষা জীবনের ভবিষ্যৎকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিষয়টিকে হালকাভাবে না দেখে এর নেপথ্যের মূল কারণগুলো নিরপেক্ষভাবে উদঘাটন করা জরুরি। এককথায়, বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এর মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। কোনো কোনো পক্ষ তাদের উৎসাহও দিয়েছে।

পরীক্ষায় এই ফল বিপর্যয়ের পেছনে কেবল অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পাঠদানে ঘাটতি কিংবা শিক্ষক সংকটই একমাত্র কারণ নয়; বরং দেশের সাম্প্রতিক পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনমুখী আচরণ এবং পড়াশোনায় বিচ্ছিন্নতা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা নিয়মিত পাঠদানে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটায়। ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীসময়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনেকে বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। অবকাঠামোগত ত্রুটি, পাঠদানের ঘাটতি, শিক্ষকস্বল্পতা ও বৈরী আবহাওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। এসবের কুফল এবারের ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। এর মধ্য দিয়ে অনেকের পড়াশোনায় ভাটা পড়তে শুরু করে।

এর পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, অপরিণত বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি তীব্র আসক্তি এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার শিক্ষার্থীদের মনোযোগ পড়ার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতেও মোবাইল ফোন পৌঁছে গেছে, যা মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতির পাশাপাশি পড়াশোনায় চরম উদাসীনতা তৈরি করছে। ফলে বাড়ছে মুঠোফোন-আসক্তি, আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

পারিবারিক ও সামাজিক তদারকির প্রবল অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে অনেক অভিভাবকের অনভিপ্রেত প্রশ্রয় সন্তানকে পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত হতে সাহায্য করছে। পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, আধুনিক চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার প্রতি অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান থেকে যোগাযোগ করা হলে অভিভাবকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সহযোগিতার বদলে উল্টো অন্যায় সমর্থনের চিত্র মিলছে। ছোটবেলায় ছাত্রজীবন রচনা লেখার সময় সূচনা হিসেবে লিখেছিলাম, ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’—অর্থাৎ অধ্যয়নই (পড়াশোনা) ছাত্রদের তপস্যা। বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের মোক্ষম সময় ছাত্রজীবন, কারণ এ সময়ে সাধারণত সাংসারিক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে মানসিক চাপ থাকে না। অনিয়ন্ত্রিত ফেসবুক ব্যবহার, কিছু অভিভাবকের প্রশ্রয় এবং সঠিক সময়ে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা না করা—এসব কিশোরসমাজকে অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত পথে যেতে উৎসাহিত করেছে। আমাদের নিজেদের দুটি চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান (ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও ইউনিভার্সেল নার্সিং কলেজ) পরিচালনার অভিজ্ঞতায় যে বিষয়টি আমার চোখে পড়ছে, তা হলো কিছু কিছু বাবা–মায়ের দায়িত্বহীনতা, শৈথিল্য ও সন্তানকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া তাদের স্বাভাবিক। এমনকি তাঁরা সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের পক্ষেও অবস্থান নেন।

শিক্ষা ব্যবস্থার এই গুণগত অবক্ষয় কেবল কেন্দ্রীয় পর্যায় নয়, বরং প্রান্তিক স্তরেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বিগত ১৫ বছর ধরে ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় সেরা ১০-১৫টি স্কুলের প্রথম স্থান অধিকারী শতজন মেধাবী শিক্ষার্থীর অনেকেই এসএসসি বা প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারছে না। প্রাতিষ্ঠানিক মেধার এই নিম্নগামী সূচক স্পষ্ট করে দেয় যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ভিত্তি থেকেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি। ১৫ বছর ধরে সেখানে আমার পিতার পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ প্রদান করে আসছি। সেখানে স্থানীয় ১০ থেকে ১৫টি সেরা স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিবছর ১০০ জনকে এই বৃত্তি দেওয়া হয়।

একটি জাতির আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ভিত্তির ওপর। শিক্ষায় এমন বিপর্যয় চলতে থাকলে তা কেবল ভর্তি পরীক্ষায় প্রভাব ফেলবে না, বরং জাতীয় উন্নয়নকেও থমকে দেবে। একই সঙ্গে অকৃতকার্য হওয়ার পর তীব্র মানসিক চাপ ও হতাশায় অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে পারে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এই মহাসসংকট থেকে উত্তরণে কেবল সরকারি পদক্ষেপ বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারে সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সন্তান কখন কী করছে, সেদিকে পিতা-মাতাকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের অভিভাবকত্ব পুনপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থার এই গভীর ক্ষত মেরামত করা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্রকে জরুরি ভিত্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে প্রশাসনিক ও পাঠ্যক্রমগত সংস্কার আনতে হবে। আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে আগে মেধা, নৈতিকতা ও সুশিক্ষায় আলোকিত সচেতন নাগরিক তৈরি করতে হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর গভীরভাবে অনুসন্ধান করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

লেখক: ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।