প্রিন্ট এর তারিখ : ৪ নভেম্বর ২০২৬ ।। প্রকাশের তারিখ : ৩ নভেম্বর ২০২৬

সাধারণ চাকরি ছেড়ে যেভাবে কোটিপতি হলেন সুমুখী সুরেশ

সাধারণ চাকরি ছেড়ে যেভাবে কোটিপতি হলেন সুমুখী সুরেশ
, বিনোদন ডেস্ক

করপোরেটের নিরাপদ চাকরি জলাঞ্জলি দিয়ে স্ট্যান্ডআপ কমেডির দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন সুমুখী সুরেশ। কিন্তু গ্ল্যামারনগরী মুম্বাইয়ে আসার পর তার মোহভঙ্গ হয় এবং তিনি বুঝতে পারেন, এই স্বপ্নের শহর যতটা রঙিন, বাস্তব জীবনে বেঁচে থাকা তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ব্যয়বহুল। বর্তমানে নেটফ্লিক্সে প্রচারিত তার প্রথম একক কমেডি অনুষ্ঠান ‘হোমোনাল’ নিয়ে চারদিকে চলছে জোর আলোচনা। কিন্তু মুম্বাইয়ে এসে বুঝেছিলেন, স্বপ্নের চেয়ে ব্যয়বহুল শহরের বাস্তবতা অনেক কঠিন। ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, এই কাজগুলোর প্রতিই তাঁর আগ্রহ বেশি।

এই নতুন কাজটির সুবাদে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অতীত সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন সুমুখী। স্বপ্নের পেছনে ছোটার দীর্ঘ যাত্রায় কীভাবে অর্থকষ্ট, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার লড়াই তার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল, সেই গল্প জানিয়েছেন তিনি। মুম্বাইয়ে আসার শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে তিনি জানান, অন্য সাধারণ মানুষের মতো তাকেও জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তীব্র লড়াই করতে হয়েছে। কারণ, আমি কিছুটা অবাস্তব কল্পনার মধ্যেও ছিলাম। পেছনে ফিরে নিজের সিদ্ধান্তকে বড় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখেন তিনি। প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে আবেগ, অধিকারবোধ ও অনুসরণের প্রবণতা কীভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা কমেডির মোড়কে তুলে ধরা হয়।

মুম্বাইয়ে পা রাখার সময় তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোটে ৫০ হাজার রুপি বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৭ হাজার টাকা জমা ছিল। ওই সামান্য পুঁজি নিয়ে বড় শহরে টিকে থাকাটাই ছিল তার প্রধান চ্যালেঞ্জ। করপোরেট পরিবেশের নিশ্চয়তা ছেড়ে আসার সময় সিদ্ধান্তের পরিণতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবেননি তিনি। পরবর্তীতে উপলব্ধি করেছেন যে, জীবনের প্রতিটি বড় পদক্ষেপের সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। ভেবেছিলাম, এই টাকা দিয়ে তিন–চার মাস চলে যেতে পারব। এখন মনে হয়, কী হাস্যকর ধারণা ছিল সেটা।

নাগপুরের একটি রক্ষণশীল ও মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সুমুখীর কমেডিয়ান হওয়ার যাত্রাটা সহজ ছিল না।

পুষ্টিবিজ্ঞান ও ডায়েটেটিকস নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি খাদ্য পরীক্ষাগার ও মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থায় কাজ করেছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের গণ্ডির বাইরে নিজের ভেতরের সৃজনশীল সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে চাইতেন তিনি। সন্ধ্যার ফাঁকা সময়ে তাৎক্ষণিক অভিনয় বা ইমপ্রোভাইজেশন চর্চা করার পাশাপাশি ছোট স্কেচ তৈরি শুরু করেন এবং বুঝতে পারেন এই মাধ্যমেই তার আসল মন পড়ে আছে।

করপোরেট চাকরি আর সৃজনশীল কাজ একসঙ্গে সামলানো যখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল, তখন পেশা হিসেবে কমেডিকেই বেছে নেন তিনি। ২০১৯ সালে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পেয়েছিল তার প্রথম স্ট্যান্ডআপ স্পেশাল ‘ডোন্ট টেল আম্মা’। রক্ষণশীল পরিবার থেকে আসা একজন নারীর জন্য পরিবার ও সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই পথ বেছে নেওয়া ছিল রীতিমতো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বেঙ্গালুরুতে ২০১৩ সালের দিকে প্রথম স্ট্যান্ডআপ কমেডির মঞ্চে যুক্ত হন সুমুখী। ২০১৪ সালে ‘আনু আন্টি’ নামের একটি প্যারোডি ভিডিওতে অভিনয় করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেন তিনি। এরপর একে একে ‘বেহতি নাক’ এবং মকুমেন্টারি সিরিজ ‘বেটার লাইফ ফাউন্ডেশন’-এ কাজ করে অভিনেত্রী ও লেখক হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। বেঙ্গালুরু–ভিত্তিক কমেডি দল দ্য এনথু কাটলেটসের সঙ্গে কাজ করা এই ভিডিওতে তিনি এমন এক আন্টির চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নাক গলাতে ভালোবাসেন। প্রেমের টানে বেঙ্গালুরুতে আসা এক তরুণীর গল্প নিয়ে তৈরি সিরিজটি প্রচলিত রোমান্টিক গল্পের বাইরে গিয়ে এক অস্বস্তিকর, জটিল নারী চরিত্রকে সামনে আনে। প্রচলিত কাস্টিংয়ের ধরন নিয়ে একাধিকবার হতাশা প্রকাশ করেছেন সুমুখী। সুমুখীর ভাষায়, গল্প বলার ধরন বদলাতে হলে শুধু অভিযোগ করলে হবে না, নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেও নারীদের থাকতে হবে। তাঁর ভাবনা ছিল, পর্দায় নারীদের শুধু আদর্শ স্ত্রী, আকর্ষণীয় প্রেমিকা কিংবা খলনায়িকা হিসেবে দেখানো হবে না; বরং বাস্তব জীবনের মতোই তাঁদের মধ্যে থাকবে নানা বৈপরীত্য, ভুল, দুর্বলতা ও শক্তি। নামের মধ্যেই রয়েছে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার ইঙ্গিত। অনুষ্ঠানটি নিয়ে তাঁর নিজেরও প্রত্যাশা ছিল না যে দর্শক এতটা আবেগের সঙ্গে যুক্ত হবেন।

তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক হলো ‘পুষ্পাবল্লী’ ওয়েব সিরিজ। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর এই সিরিজে নামভূমিকায় অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি এর নির্মাণ ও লেখালেখির দায়িত্বেও ছিলেন। ২০১৭ সালে প্রথম মৌসুম এবং ২০২০ সালে দ্বিতীয় মৌসুম মুক্তির পর সিরিজটি তাকে নির্মাতা ও অভিনেত্রী হিসেবে দারুণ খ্যাতি এনে দেয়। ২০২১ সালে প্রভাবশালী ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে তাঁকে ভারতের ডিজিটাল বিনোদনজগতের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট নির্মাতাদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

অভিনয়ের জগতে নিজের কাঙ্ক্ষিত চরিত্র পাওয়া নিয়ে তিনি অতীতে হতাশার কথা জানিয়েছিলেন। প্রচলিত সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে না পড়ার কারণে তাকে প্রায়ই বোন বা বন্ধুর মতো গতানুগতিক পার্শ্বচরিত্রে ভাবা হতো। এই বেড়াজাল ভেঙে নিজের পছন্দমতো প্রধান চরিত্র নিজেই তৈরির তাগিদ অনুভব করেছিলেন তিনি। সেই লক্ষ্যেই ২০২১ সালে তিনি নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মোটরমাউথ চালু করেন এবং পর্দায় নারীদের গতানুগতিক উপস্থাপন বদলানোর উদ্যোগ নেন। তাঁর মতে, প্রচলিত সৌন্দর্যের মাপকাঠির সঙ্গে না মিললে অনেক অভিনেত্রীই পছন্দের চরিত্র পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

সুমুখীর সাম্প্রতিক সৃষ্টি ‘হোমোনাল’ অনুষ্ঠানটি ২০২১ সাল থেকে লেখা ও ধারণার কাজ শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন শহর ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রদর্শনের পর ২০২৪ সালে এডিনবরা ফ্রিঞ্জ উৎসবেও এটি প্রশংসিত হয়। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া এই বিশেষ অনুষ্ঠানে তিরিশের দশকের নারীর জীবন, হরমোনজনিত জটিলতা, একাকিত্ব, সম্পর্ক এবং মাতৃত্বের সামাজিক চাপকে হাস্যরসের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। পরে ছোট ছোট ভিডিও ও স্কেচের মাধ্যমে পরিচিতি পেতে শুরু করেন। অনুষ্ঠানটির নামও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘হোমোনাল’ শব্দটি হরমোনের পরিবর্তন এবং নারীর যৌনতা ও সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মজা করে তৈরি।

এই পরিবেশনায় নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ছোঁয়া রেখেছেন সুমুখী। দীর্ঘদিনের একটি সম্পর্কে থাকার অভিজ্ঞতা এবং বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার পরও সম্পর্ক ভাঙার গল্প তিনি সামনে এনেছেন। রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠায় ব্যক্তিগত জীবনে অতিཆ স্বাধীনতা না পাওয়ার আক্ষেপ থেকেও তিনি তরুণ প্রজন্মের মেয়েদের জীবনকে আরও হালকাভাবে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে সুমুখী বলেন, করপোরেট জীবনে থাকার সময়ই তাঁর মনে হয়েছিল, কিছু একটা অপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, জীবনের প্রায় ১০ বছর একটি সম্পর্কে ছিলেন।

আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের বিচারবুদ্ধিহীন মন্তব্য নিয়ে কৌতুক করে তিনি জানান, কমেডির টানে চাকরি ছাড়ার পর পরিবারের দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জনপ্রিয় এই কমেডিয়ানের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি রুপি বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। চরিত্রটি দর্শকের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়।