প্রিন্ট এর তারিখ : ৩ নভেম্বর ২০২৬ ।। প্রকাশের তারিখ : ৩ নভেম্বর ২০২৬

যুদ্ধবিরতি শেষ হতেই ইউক্রেনে বিমান হামলা রাশিয়ার, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬

যুদ্ধবিরতি শেষ হতেই ইউক্রেনে বিমান হামলা রাশিয়ার, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬
, বিশ্ব ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের ওলেশকি শহর থেকে বেসামরিক মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে গত মঙ্গলবার থেকে একটি স্থানীয় যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘতম বিরতি। তবে রবিবার এই সাময়িক বিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলে ফের ভয়াবহ হামলা শুরু করে রুশ বাহিনী। পাঁচ বছরে গড়ানো এ যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখো মানুষ।

জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের একটি গ্রামে মানবিক সহায়তা কেন্দ্রে বিমান হামলা চালায় রাশিয়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, প্রতি সোমবার একটি স্থানীয় স্কুলে সাধারণ মানুষের মধ্যে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা বিতরণ করা হতো। লোকজন সেখানে জড়ো হওয়া মাত্রই রুশ যুদ্ধবিমান প্রথম দফায় বোমা ফেলে। এরপর মানুষ যখন আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন দ্বিতীয় দফায় আবার হামলা চালানো হয়।

এই জোড়া বিমান হামলায় অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন জাপোরিঝঝিয়ার ভারপ্রাপ্ত গভর্নর মিখাইলো সেমিকিন। হামলায় ধসে পড়া স্কুল ভবনের ধ্বংসস্তূপে এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে। ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ প্রকাশিত ভিডিওতে ধোঁয়া ওঠা ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ ও আহতদের বের করতে দেখা গেছে।

নিহতদের মধ্যে জরুরি সেবা বিভাগের দুজন উদ্ধারকর্মী ও চারজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। নিহত দুই উদ্ধারকারীর পরিচয় প্রকাশ করেছে জরুরি বিভাগ; তাঁরা হলেন ৪৪ বছর বয়সী ডেনিস কোনোভালেঙ্কো এবং ওলেক্সি সুশচেভস্কি। সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে তাঁরা নিজেরা প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানানো হয়। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করতেন এবং অন্যদের জীবন বাঁচাতে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতেন।

যুদ্ধবিরতি শেষ হতেই রাশিয়ার এমন হামলাকে শান্তির সব সম্ভাবনার ওপর বড় আঘাত বলে বর্ণনা করেছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ওলেশকিতে মানবিক পদক্ষেপ সফল হওয়ার পর শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মস্কো বুঝিয়ে দিল তারা কেবল আরও ধ্বংস ও সহিংসতাই চায়, যার কঠোর জবাব দেওয়া প্রয়োজন। জেলেনস্কি বলেন, ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতির পর এমন একটি মুহূর্ত এসেছিল, যখন পরবর্তী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে শান্তির পথে অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত।

এদিকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে কিয়েভের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও রাশিয়া তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে এএফপিকে জানিয়েছেন ইউক্রেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। অপরদিকে কিয়েভের সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, যুদ্ধবিরতিকে কাজে লাগিয়ে রুশ বাহিনী নিজেদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউক্রেনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ১ নভেম্বর এএফপিকে জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কিয়েভের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো। এদিকে ট্রাম্প ক্রমেই মস্কোর পক্ষ নিচ্ছেন বলে উদ্বিগ্ন কিয়েভ ও ইউরোপের মিত্রদেশগুলো।

রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইউক্রেনের অভিযোগ অস্বীকার না করে বলেন, যুদ্ধের সময় এ ধরনের পদক্ষেপ একটি স্বাভাবিক চর্চা।

অতীতে ইউক্রেনীয় বাহিনীও বিরতির সুযোগে নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে।

তবে ওলেশকিতে মানবিক অভিযান সফল হয়েছে উল্লেখ করে পেসকভ জানান, সব পক্ষের মধ্যে ভালো সহযোগিতা ছিল। এই প্রক্রিয়ায় যৌথভাবে তদারকি করেন রাশিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার ইয়ানা লানত্রাতোভা এবং ইউক্রেনের দিমিত্রো লুবিনেৎস। অভিযানের মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের ইউক্রেন নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও ক্রিমিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়। অবশ্য ক্রেমলিন স্পষ্ট করেছে, এই মুহূর্তে এ জাতীয় নতুন কোনো মানবিক অভিযানের পরিকল্পনা তাদের নেই। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার ইয়ানা লানত্রাতোভার ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি। নিজের পা নিজেই কাটলেন ইউক্রেনীয় সেনা, তারপর ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন মৃত্যুপুরী থেকে।

রণাঙ্গনে উত্তেজনার মধ্যেই কূটনীতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ২ নভেম্বর জানান, আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে মার্কিন মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আবার শান্তি আলোচনা শুরু হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার চেষ্টা করছেন, যদিও এতে অগ্রগতি সামান্য। ইউক্রেন ও তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের আশঙ্কা, আলোচনায় ট্রাম্প ক্রমশ রাশিয়ার প্রতি নমনীয় অবস্থান নিচ্ছেন।

একই দিনে দুই দেশের জরুরি সতর্কতামূলক অ্যাপ ও প্রযুক্তিতে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইউক্রেনের বিমান হামলার সতর্কতাব্যবস্থা হ্যাক করে লাখ লাখ নাগরিকের কাছে তেজস্ক্রিয়তার ভুয়া বার্তা পাঠানো হয়। এই সতর্কতাব্যবস্থাটি মূলত রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দ্রুত তথ্য দিয়ে থাকে। অন্যদিকে রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি অ্যাপও সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। তবে রাশিয়ায় ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তথ্য প্রধানত সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল খুদে বার্তার মাধ্যমে দেওয়া হয় বলে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত ছিল।

চলতি বছর রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও দ্রুতগতির জেট ইঞ্জিনচালিত অস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে ইউক্রেনে হামলার তীব্রতা বহু গুণ বাড়িয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের আধুনিক অস্ত্র প্রতিহত করা কিয়েভের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।