প্রিন্ট এর তারিখ : ২ নভেম্বর ২০২৬ ।। প্রকাশের তারিখ : ২ নভেম্বর ২০২৬

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে কমেছে তেলের দাম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে কমেছে তেলের দাম
, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুর দিকে অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পায়। সম্ভাব্য সংঘাত নিরসনে ইরান ও কাতারের সরকারি কর্মকর্তারা টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই কূটনৈতিক যোগাযোগের কারণেই বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে তাৎক্ষণিক এই প্রভাব পড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বর্তমান দর

সোমবার দুপুর ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলার ৮০ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ৫০ সেন্টে স্থির হয়। বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অয়েলপ্রাইস ডটকম ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

এর আগে গত অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। মাসটিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মোট ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম বাড়ে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। গত ৩০ অক্টোবর মাসের শেষ কার্যদিবসে ব্রেন্ট ক্রুডের দর উঠেছিল ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলারে, যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ, ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৭ ডলার।

মার্কিন নির্বাচন ও কূটনৈতিক আলোচনার প্রভাব

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আশঙ্কা ছিল যে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিংবা নির্বাচনের পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার হতে পারে। নির্বাচনপরবর্তী সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার চরম উদ্বেগে ছিলেন বিশ্ববাজারের ব্যবসায়ীরা, যা তেলের বাজারে বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল।

তবে সামরিক আশঙ্কার মুখেও কূটনৈতিক আলোচনার খবর প্রকাশ্যে আসায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার রয়টার্সকে জানান, গত সপ্তাহে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির পর কূটনৈতিক উদ্যোগের কারণে বাজারে একটি স্বাভাবিক মূল্য সংশোধন বা অ্যাডজাস্টমেন্ট ঘটেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বা বক্তব্য যদি আরও কঠোর হয়, তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।

চীনে চাহিদা হ্রাস ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও তেলের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে না বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে চীনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ব্যবহারকারী দেশ চীনে তেলের সামগ্রিক চাহিদা কমে গেছে। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি দীর্ঘ দিন ধরে ধীর গতিতে চলছে। পাশাপাশি চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশও এখন চীনকে অনুসরণ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে ঝুঁকছে, যা বৈশ্বিক স্তরে অপরিশোধিত তেলের চাহিদা বৃদ্ধিতে বাঁধ সাধছে।

কাতারের মধ্যস্থতা ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী সংঘাত কমাতে কাতার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। কাতারভিত্তিক আলোচনায় অগ্রগতির কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও যুদ্ধের স্থায়ী অবসান বা পূর্ণাঙ্গ সমঝোতার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তেলের বাজার বর্তমানে এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি বিবেচনা করছে—একদিকে যেমন রয়েছে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে হঠাৎ সংঘাত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গত রোববার এক বিবৃতিতে জানান, কাতারের পরামর্শ ও মধ্যস্থতায় আলোচনা অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে। তবে কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ইরান একই সাথে প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি—উভয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

ওপেক প্লাসের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন নীতি

বিশ্ববাজারে তেলের দর ওঠানামায় রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক ও তাদের সহযোগী জোট (ওপেক প্লাস) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জোটটি তেলের সরবরাহ বা উৎপাদন বাড়ালে সাধারণত বাজারে দাম কমে, আর উৎপাদন ছাঁটাই করলে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। অবশ্য তেলের আন্তর্জাতিক দর শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; বরং বৈশ্বিক চাহিদা, মজুদ পরিস্থিতি, পরিবহন খরচ, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও মার্কিন ডলারের বিনিময়মূল্যের ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল।

বিদ্যমান অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে ডিসেম্বর মাসে অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের দৈনিক লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওপেক প্লাস। গত রোববার সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ জোটের সাতটি প্রভাবশালী দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ প্রক্রিয়া যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থেকে এই পদক্ষেপ নিয়েছে জোটটি। আগামী ২৯ নভেম্বর ওপেক প্লাসের পরবর্তী নীতি নির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে ২০২৭ সালের জ্বালানি তেল উৎপাদন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।