প্রিন্ট এর তারিখ : ২ নভেম্বর ২০২৬ ।। প্রকাশের তারিখ : ১ নভেম্বর ২০২৬

অভাবকে জয় করে অদ্বিতীয়া বৃত্তিতে স্বপ্নপূরণ পাঁচ শিক্ষার্থীর

অভাবকে জয় করে অদ্বিতীয়া বৃত্তিতে স্বপ্নপূরণ পাঁচ শিক্ষার্থীর
, জীবনযাপন ডেস্ক

অদম্য মেধাবী অথচ দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি ও ট্রাস্ট যৌথভাবে চালু করেছে ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি। দরিদ্রতম পরিবারের প্রথম মেয়েসন্তান, যাঁরা নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছান, তাঁদের অনুপ্রাণিত করতে দেওয়া হয় আইডিএলসি ও ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি। সংসারে অভাব থাকলেও বাবা সব সময় স্বপ্ন দেখেছেন, আমি পড়ালেখা করব, বড় হব। বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

এই বৃত্তির আওতায় মূলত এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) ছাত্রীদের পড়াশোনার ব্যয়, আবাসন ও টিউশন ফি মওকুফসহ নানা সুযোগ দেওয়া হয়।

২০১২ সাল থেকে ট্রান্সকম গ্রুপের সহযোগিতায় ৪২ জন এবং ২০১৭ সাল থেকে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের সহায়তায় ১০১ জন—সব মিলিয়ে মোট ১৪৩ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তির সুবিধা পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত ৮৬ জন স্নাতক সম্পন্ন করেছেন, যাঁদের অনেকেই বর্তমানে দেশে ও বিদেশে কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছেন। চলতি বছর নতুন করে আরও ১৫ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে পাঁচজনের সংগ্রামের কথা নিচে তুলে ধরা হলো। ৮৬ জনের এরই মধ্যে স্নাতক শেষ হয়েছে।

শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা-বাগানের এক শ্রমিকের ঘরে জন্ম নেওয়া এক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে বাবার কষ্ট দূর করা। চা-শ্রমিক বাবার প্রতিদিনের মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। অভাবের কারণে স্কুলের গাইড বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, বন্ধুদের থেকে ধার করেই চলেছিল পড়াশোনা। কঠোর পরিশ্রমে ২০২২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। একাদশ শ্রেণিতে কোচিংয়ের টাকা না থাকায় স্মার্টফোন না থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়ের ফোনে ইউটিউব দেখে ক্লাস করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, যেখানে দুই বোনের পড়াশোনার দায়িত্বও বাবার কাঁধে। তাঁর এই কষ্ট, তাঁর স্বপ্ন ছোটবেলা থেকে আমাকেও প্রভাবিত করেছে। আমার দুই ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও বাবাকেই বহন করতে হয়। রেজাল্ট হয়তো খুব ভালো না; কিন্তু এর পেছনে যে কী সংগ্রাম ছিল, সেটা শুধু আমি আর আমার পরিবারই জানি। পড়ুন তাঁদের মধ্যে ৫ জনের গল্প। চা-বাগানের শ্রমিকের সন্তান হিসেবে অভাব-অনটন খুব কাছ থেকে দেখেছি; কিন্তু কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবিনি। তবে মা-বাবার ইচ্ছা ছিল, তাঁরা উচ্চশিক্ষা না পেলেও সন্তানদের শিক্ষিত করবেন। কখনো মাসে সাত হাজার টাকা আয় হতো, কখনো তার অর্ধেকেরও কম। এখন আমার ছোট বোন নার্সিং কলেজে পড়ে।

আরেক শিক্ষার্থীর গল্পটি সংগ্রামের। তিনি ২০২৩ সালে এসএসসি ও ২০২৫ সালে এইচএসসি পাস করেছেন। তার পরিবারে সাতজন সদস্য। বাবা কৃষক ও মা চা-শ্রমিক। বাবার আয়ের অনিশ্চয়তা আর মায়ের সামান্য মজুরিতে সংসার চালানোই দায়। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য চট্টগ্রাম শহরে থাকাকালীন মা-বাবাকে প্রতি মাসে হিমশিম খেতে হয়। এই বৃত্তি তার পরিবারের আর্থিক সংকট কিছুটা লাঘব করবে বলে আশা তার।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুমচাষি পরিবারের আরেক মেয়ের জীবন সংগ্রাম আরও কঠিন। অভাবের দিনে ক্ষুধা পেটে রাত কাটাতে হয়েছে তাকে। স্কুলের পোশাক কেনার টাকা জোগাতে অন্যের জুমেও কাজ করতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে ঢাকায় গিয়ে কাজ শুরু করেন। সেখানেই বৃত্তির খোঁজ পেয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ‘প্রি-আন্ডারগ্র্যাড পাথওয়ে’ কোর্সে সুযোগ পান। অদ্বিতীয়া বৃত্তি এখন তার পড়াশোনার পথকে সহজ করেছে। এমন দিনও গেছে, ক্ষুধা পেটে রাত কাটিয়েছি।

পরিবারে চরম সংকটে থাকা অন্য এক শিক্ষার্থীর বাবা ২০২৩ সালে কিডনির রোগে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর থেকে মা সেলাইয়ের কাজ করে সংসার ও দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করছেন। নিজের খরচ নিজে চালিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়লে বৃত্তিটি তার দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমিয়েছে।

পরের জন মায়ের সংগ্রামের ফসল। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মা একাই তিন সন্তানকে বড় করেছেন। নিজেদের বাড়ি না থাকায় মামার বাড়িতে বড় হয়েছেন তিনি। ভাইয়ের পড়াশোনা করার সুযোগ না হলেও সে বোনদের পড়াশোনায় সাহায্য করেছে। প্রথমবার এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ না পেলেও দ্বিতীয়বার বৃত্তিসহ ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন তিনি। আর্থিক সংকটে দিন কাটানো অন্য মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য তার।