দিল্লিতে যান চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ, বাড়বে নিত্যপণ্যের দাম

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লি সরকার একগুচ্ছ কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়তে যাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত বিএস-৬ মানদণ্ডের নিচের সব পেট্রল ও ডিজেলচালিত যানবাহনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর, ছোট যানবাহনসহ দুই ও তিন চাকার বাহন পড়ছে। শুধু বিদ্যুৎ, সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত যান এবং বিএস-৬ মানদণ্ডের গাড়িই দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি পাবে। পাশাপাশি এ-ও ঠিক, দিল্লিতে দূষণযুক্ত যান প্রবেশের বিষয়ে কঠোর হুকুম দেওয়া হলেও এ সময়ে দীপাবলিসহ বিভিন্ন উৎসব ও বিয়েশাদিতে যে বিপুল পরিমাণ আতশবাজি পোড়ানো হয়, তা দূষণের মাত্রা মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে সংশয়ও, দূষণযুক্ত যান বন্ধের নির্দেশ ঘিরে। দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি থাকছে শুধু ‘বিএস ৬’ মানদণ্ডের গাড়ি এবং সেসব যান যেগুলো বিদ্যুৎ, সিএনজি অথবা ব্যাটারিতে চলে। এ পদক্ষেপের ফলে কী হতে চলেছে—পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানই তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে। ‘বিএস ১’ থেকে ‘বিএস ৪’ মানদণ্ডের ৪৮ লাখ বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর ও অন্যান্য গাড়ি দিল্লির লাগোয়া ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়নে (এনসিআর) নথিভুক্ত। প্রায় প্রতিদিনই এসব গাড়ি রাজধানী দিল্লিতে আসা-যাওয়া করে। এসব যানবাহনেই জম্মু কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশ থেকে দিল্লিতে আপেল আসে। সেই সব এলাকার রাস্তা, গাছপালায় পানি স্প্রে করতে হবে, যাতে ধূলিকণা বাতাসে উড়ে ‘পিএম ২’ বৃদ্ধি করতে না পারে। কিন্তু এবার তা কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্যামেরা গাড়ির দূষণের মানদণ্ড চিহ্নিত করবে। পশ্চিমি হাওয়ায় ভর দিয়ে সেই ধোঁয়া দিল্লি ছেয়ে ফেলে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে নিত্যপণ্যের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এনসিআরভুক্ত এলাকা যেমন উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদ বা হরিয়ানার ফরিদাবাদ থেকে দিল্লির প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে পণ্য সরবরাহ হয়। এই যানগুলো চলাচল বন্ধ হওয়ায় মাছ, মাংস, ডিম, আলু, পেঁয়াজসহ কাঁচা শাকসবজির সরবরাহ ব্যাহত হবে। সর্বভারতীয় মোটর ট্রান্সপোর্ট কংগ্রেসের মতে, আড়াই লাখ পণ্যবাহী যান এই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়বে, যা হিমাচল, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও রাজস্থান থেকে আসা জরুরি পণ্য পরিবহনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। যানবাহনের ভাড়া যেমন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে, তেমনই বেড়ে যাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী; বিশেষ করে মাছ-মাংস-ডিম থেকে শুরু করে আলু-পেঁয়াজ-শাকসবজির দাম। এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান সমস্যা। ব্যাপারীদের আশঙ্কা, মান্ডিতে মালপত্র আসা ব্যাহত হলে এবং তা দিল্লি ঢুকতে না পারলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে বাধ্য।
যান চলাচল তদারকির জন্য দিল্লি ঢোকার পথে এআই-চালিত ‘অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন’ ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং ৩০০ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পেট্রলপাম্পগুলোকে দূষণরোধ সার্টিফিকেট ছাড়া জ্বালানি না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিসে ৫০ শতাংশ কর্মীর জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং জরুরি কিছু সরকারি প্রকল্প ছাড়া নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে। চেকপোস্টগুলোয় মোট ৩০০ কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে, যাঁরা নির্দেশ মানা হচ্ছে কি না, তদারক করবেন। তা ছাড়া প্রত্যেক জায়গাতেই ব্যারিকেড রাখা হচ্ছে। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও নিষিদ্ধের আওতায় রয়েছে নির্মাণকাজ।
এদিকে, দিল্লির এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ও কার্যকরিতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞার আড়ালে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে বিরোধী সমাবেশের ভিড় কমানোর কোনো কৌশল আছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি দূষণের জন্য দায়ী বাজি পোড়ানো রোধে প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টও ক্ষুব্ধ। গত ২৯ অক্টোবর বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ ও বিচারপতি পি বি ভারালের ডিভিশন বেঞ্চ হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, বাজি পোড়ানো বন্ধে আদালতের নির্দেশ কেবল তাত্ত্বিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। তারা পরামর্শ দিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বিরাট কোহলির মতো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো বেশি কার্যকর হতে পারে।
শীতকালে দিল্লির বায়ুর গুণমান বা একিউআই সূচক সাধারণত ২০০ থেকে ৩৫০-এর মধ্যে থাকে, যা ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে ৩৫০ থেকে ৪০০ এবং কখনো কখনো ৫০০ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ধোঁয়াশা দূর করতে বাজি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হলেও ধর্মীয় আবেগের কারণে তা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় ফসল কাটার পর খেতের গোড়া জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রথা এবং নির্মাণজনিত ধূলিকণাও দূষণ বাড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে, দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক এই কঠোর পদক্ষেপ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় থেকেই যাচ্ছে। দিল্লির দূষণ ঠেকাতে একগুচ্ছ বিধিনিষেধের ফলে কাজের কাজ কতটা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এর ফলে মূল্যবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। শীতকালে দিল্লির দূষণ কমাতে যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা নতুন ব্যাপার নয়।