লালমনিরহাটে ছাগল খুঁজতে গিয়ে চিতা বাঘের হামলার শিকার নারী

লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তে গত ২৫ অক্টোবর বিকেলে একটি চিতা বাঘের আক্রমণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা শরীফা বেগম তার পোষা ছয়টি ছাগলের মধ্যে একটিকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ছাগলটি খুঁজতে গিয়ে তিনি সীমান্তের কাছাকাছি গেলে হঠাৎ একটি চিতা বাঘের সামনে পড়েন। বাঘের আক্রমণে শরীফা বেগম আহত হন এবং তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুজন স্থানীয় ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে জখম হন। গোচারণভূমিতে চরা শেষে প্রতিদিন ঘরে ফিরে আসে ছাগলের দল। তিনি বলেন, আমঝোল গ্রামের বাসিন্দা শরীফা বেগমের ছয়টি ছাগল ছিল। কোনো নীলগাই, হরিণ, চিতা এমনকি একটি ছোট বনবিড়াল দেখলেও সবাই লাঠিসোঁটা নিয়ে হত্যা করতে নেমে যায়।
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক আবদুল্লাহ আস সাদিক জানিয়েছেন, পায়ের ছাপ ও কামড়ের গভীরতা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি একটি চিতা বাঘ। বাঘটির আক্রমণে নিখোঁজ ছাগলটি মারা গেছে। ঘটনার পর ঢাকা থেকে চার সদস্যের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দীর্ঘ তল্লাশি চালিয়েছে। বাঘটিকে না পাওয়ায় দলটি শুক্রবার ঢাকায় ফিরে এসেছে। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, বিজিবির সহায়তা নিয়ে গোতামারীসহ সীমান্তসংলগ্ন পাঁচটি ইউনিয়নে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং মানুষকে সচেতন করতে মাইকিং করা হয়েছে। সর্বশেষ বিজিবির থার্মাল ড্রোনের তথ্যানুযায়ী, বাঘটি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমঝোল সীমান্তের ওপারে ভারতের ডুয়ার্স ও বক্সার সংরক্ষিত বনাঞ্চল অবস্থিত, যা চিতা বাঘের স্বাভাবিক আবাসস্থল। চিতা বাঘ অত্যন্ত ক্ষিপ্র হওয়ায় গাছ বেয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর দিয়ে লাফিয়ে বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করতে পারে বলে ধারণা করছেন আবদুল্লাহ আস সাদিক। মূলত খাবারের সন্ধানে বা আবাসস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এরা লোকালয়ে চলে আসে। এর আগেও এই অঞ্চলে মাঝে মাঝে সীমান্ত পেরিয়ে চিতা বাঘের প্রবেশের নজির রয়েছে বলে বন বিভাগ জানিয়েছে। আবদুল্লাহ আস সাদিক বলেন, আমঝোল সীমান্তে ভারতীয় অংশের সঙ্গেই একটি শালবন, বাঁশঝাড় ও বিস্তীর্ণ ধানিজমি আছে। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া যেভাবে দেওয়া আছে তাতে বাঘ আসার সুযোগ নেই।
আক্রমণের দিন স্থানীয় হাজার হাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে বাঘটিকে পিটিয়ে মারার উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিল।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বাঘটিকে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে বিজিবি সে সময় ফাঁকা গুলি ছুড়েছিল।
এরপর রাতে রংপুর সামাজিক বন বিভাগ স্থানীয় কর্মীদের মাধ্যমে এলাকাটিতে পাহারা বসায় যাতে প্রাণীটি নিরাপদে ফিরে যেতে পারে। বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান মনে করেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় এ ধরনের ঘটনা স্বাভাবিক। তবে বন্য প্রাণীর বিষয়ে সামাজিক সচেতনতার অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অধিকাংশ সময় মানুষ বন্য প্রাণী দেখলেই আক্রমণের চেষ্টা করে, যা বাঘ বা অন্যান্য প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। পঞ্চগড়ে অতীতে এমন একটি চিতা বাঘকে পিটিয়ে মারার উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন। বন্য প্রাণী লোকালয়ে এলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং মানুষের সংবেদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এই বিশেষজ্ঞ। বন বিভাগ বলছে, চিতা বাঘ সাধারণত তিস্তা ও ধরলা নদীর অববাহিকা, চা–বাগান এবং উঁচু ফসলের খেত ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে। প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধারের জন্য রংপুর সামাজিক বন বিভাগ ওই দিনই স্থানীয় বনকর্মীদের সারা রাত সে স্থানে পাহারায় রাখে। কারণ, ছোটবেলা থেকে এসব বিষয় নিয়ে আমাদেরকে সংবেদনশীল করে তোলার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে, সামাজিকভাবে আমরা বন্য প্রাণীবিমুখ হয়ে পড়েছি।