ক্ষমতা হারালে কি গ্রেপ্তার হবেন নেতানিয়াহু, আইসিসির পরোয়ানার ভবিষ্যৎ কী

ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যতের ওপর বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যদিও বিরোধী দলগুলো আরব জোটের সঙ্গে মিলে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে, তবে সরকার পরিবর্তিত হলেও নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত আইনি সংকট সহজে শেষ হওয়ার নয়। বরং পদত্যাগ বা ক্ষমতা হারানোর পর তিনি এমন অনেক আইনি দায়মুক্তির সুযোগ হারাবেন, যা বর্তমানে তাঁর সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। পরোয়ানাটি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি পদে বহাল থাকছেন কি না, তার ওপর এই অপরাধের বিচারকাজ নির্ভর করছে না।
২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে বিচারকেরা বিচারপ্রক্রিয়ার সময় পরোয়ানা স্থগিত রাখতে রাজি হননি।
এই অভিযোগের মধ্যে গাজায় অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, হত্যা ও নিপীড়নের মতো গুরুতর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রোম সংবিধির ধারা ৫৮(৪) অনুযায়ী, আদালত অন্য কোনো সিদ্ধান্ত না নিলে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর থাকবে।
আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাঝাত শামিম খান গত সেপ্টেম্বরে নিশ্চিত করেছেন যে পরোয়ানা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা আদালতের নেই।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এই আইনি লড়াইয়ের একটি বড় দিক হলো ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও, এই দায়বদ্ধতা তাঁর ওপর প্রযোজ্য। তবে আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি পদমর্যাদা বিচারে কোনো বাধা হতে পারে না। রোম সংবিধির ২৭ নম্বর ধারা অনুসারে, কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দাপ্তরিক দায়মুক্তি এখানে কোনো সুরক্ষা দেয় না। এর আগেও জর্ডানের ঘটনাপ্রবাহের সময় ২০১৯ সালে আইসিসির আপিল চেম্বার রায় দিয়েছিল যে, সদস্য রাষ্ট্র না হলেও অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা থাকে। যেসব দেশ আইসিসির সদস্য নয়, সেসব দেশের নেতাদের ক্ষেত্রেও আদালত এই নীতি প্রয়োগ করেছেন। ২০১৯ সালে আইসিসির আপিল চেম্বার রায় দিয়েছিলেন, জর্ডানের দায়িত্ব ছিল সুদানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল–বশিরকে গ্রেপ্তার করা, যদিও সুদান আইসিসির সদস্য ছিল না। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হওয়ায় মঙ্গোলিয়া তার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে বলে ২০২৪ সালেও বিচারকেরা পর্যবেক্ষণ দেন। অপরাধের ধরন যা–ই হোক না কেন, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে বিদেশের কোনো আদালতে গ্রেপ্তার ও বিচার থেকে তাঁরা সুরক্ষা পান। কোন কোন দেশ দায়মুক্তির দোহাই দিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ সর্বজনীন এখতিয়ারের অধীনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিধান রেখে থাকে। চিলির অগাস্তো পিনোশে ১৯৯৮ সালে স্পেনের এক পরোয়ানায় লন্ডনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আইসিসির এখতিয়ারকে বারবার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এসেছে। তাদের মূল দাবি হলো, ইসরায়েল রোম সংবিধির সদস্য নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আইসিসির আপিল চেম্বার এই চ্যালেঞ্জটি খতিয়ে দেখার জন্য প্রাক্–বিচার চেম্বারকে নির্দেশ দিলেও, আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং দুটি আপিল এখনো বিচারাধীন অবস্থায় আছে। তবে ইসরায়েল এখনো আদালতের এখতিয়ার নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে, যার মূল ভিত্তি হলো তারা আদালতের প্রতিষ্ঠাতা চুক্তি ‘রোম সংবিধি’–এর সদস্য নয়। আদালতের অবস্থান হলো, পদের সঙ্গে থাকা দায়মুক্তি বা ‘ইমিউনিটি’ কোনো আসামিকে তাঁর বিচারিক এখতিয়ার থেকে রক্ষা করে না কিংবা সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ বাস্তবায়ন থেকে অব্যাহতি দেয় না। তবে দায়মুক্তি–বিষয়ক গবেষক ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্ক ২০২৫ সালে গাজাগামী ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ অবরোধের ঘটনায় নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভিরসহ বেশ কয়েকজ।
নেতানিয়াহুর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে ব্যক্তিগত আইনি সুরক্ষার বিষয়টি বেশ জটিল। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের দুই ধরনের দায়মুক্তি থাকে—ব্যক্তিগত দায়মুক্তি এবং কার্যকর দায়মুক্তি। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ালে নেতানিয়াহু তাঁর ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন, যা সাধারণত বিদেশি আদালত বা কর্তৃপক্ষের গ্রেপ্তারি থেকে তাঁকে রক্ষা করে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের জাতীয় আদালতে যুদ্ধের অপরাধে তাঁর বিচার হওয়ার পথ প্রশস্ত হতে পারে। তবে বিচারকাজ কেবল তখনই শুরু হতে পারে, যদি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হস্তান্তর করা হয়।
২০২৪ সালের শেষদিকে ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলো পরোক্ষভাবে নেতানিয়াহুর দায়মুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করেছিল। হাঙ্গেরিও ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাঁর সফরের সময় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিপরীতে ৯৮ নম্বর ধারার যুক্তি দেখিয়েছিল। তবুও, ক্ষমতা থেকে সরলে তিনি সরাসরি গ্রেপ্তার হবেন এমনটি নয়; কারণ আইসিসির নিজস্ব পুলিশ বাহিনী নেই এবং পরোয়ানা কার্যকর করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। তবে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে তিনি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বেন, যা তাঁকে ভ্রমণ সীমিত করতে বাধ্য করতে পারে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, দায়মুক্তির বিষয়টিকে সম্মান জানাতে হবে।
শুধু আইসিসি নয়, নেতানিয়াহু দেশীয় দুর্নীতির মামলায়ও বিচারের মুখোমুখি। ২০২০ সাল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি আলাদা মামলায় ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগের বিচার চলছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি অপরাধ স্বীকার না করেই প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। যদিও এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকে জানানো হয় যে, বিষয়টি আদালতের বাইরে সমঝোতার চেষ্টা করা উচিত, তবে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনীতি থেকে অবসর না নেওয়া পর্যন্ত এই ক্ষমার আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। বাশার আল–আসাদ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানা বাতিল করে দেন।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যার মামলাটিও সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দায়ের করা এই মামলা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান এবং এটি নেতানিয়াহুর বিদায়ের পরও আইনি রেকর্ড হিসেবে টিকে থাকবে। ২০২৬ সালের মার্চে ইসরায়েল এই অভিযোগের বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি ও এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ পেশ করেছে। আদালত বর্তমানে এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে পারে। নেতানিয়াহুকে হেফাজতে নেওয়া বাস্তবিক এক চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
তুরস্কের আদালতেও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গত বছর গাজায় ত্রাণ বহর আটকে দেওয়া সংক্রান্ত নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম চলছে। সব মিলিয়ে, পদত্যাগ করলেও তিনি আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, বিদেশি আদালতের বিচার প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির আইনি বেড়াজাল থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারবেন না।