উপকূলীয় জনপদের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্ভাবনী উদ্যোগ, অভিজ্ঞতা ও অভিযোজন সংগ্রামকে সামনে আনতে গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বারসিক আয়োজন করতে যাচ্ছে ব্যতিক্রমধর্মী ‘লোকালি লেড অ্যাডাপটেশন (Locally Led Adaptation) মেলা’। আগামী ৯ মার্চ সারাদিনব্যাপী এ মেলা অনুষ্ঠিত হবে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের শ্রীফলকাটি ও ধুমঘাট সংলগ্ন পাইকের মোড় বিলে।
সোমবার (২ মার্চ ‘২৬) শ্যামনগর উপজেলা অফিসার্স ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেলার বিস্তারিত তুলে ধরেন স্থানীয় কৃষক হাবিবুর রহমান। এসময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষানী অল্পনা রানী মিস্ত্রি, রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নজরুল ইসলাম, কৃষানী চম্পা রানীসহ অনেকে।
উপকূলের সংগ্রাম ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতি সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, উপকূলীয় জনপদের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার মতো বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি হয়েও নিজেদের টিকে থাকার পথ তৈরি করেছেন। স্থানীয় কৃষি পদ্ধতি, লবণসহিষ্ণু ফসল, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বিকল্প জীবিকার মাধ্যমে তারা অভিযোজনের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও উদ্ভাবনকে সামনে এনে নীতি-নির্ধারক, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করাই এ মেলার মূল লক্ষ্য। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি না দিলে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
১২টি প্রদর্শনী স্টলে স্থানীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় থাকবে ১২টি প্রদর্শনী স্টল। এসব স্টলে উপস্থাপিত হবে-ঘাস নিড়ানি যন্ত্র ও অচাষকৃত উদ্ভিদ-আগাছা নাশক উপকরণ উপকূল ও হাওর অঞ্চলের মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী সরঞ্জাম স্থানীয় অভিযোজন কৌশল ও চর্চা বিলুপ্তপ্রায় উপকূলীয় সামগ্রী নিয়ে ‘সুন্দরবন যাদুঘর’ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত উপকরণ বনজীবী ও হাওর এলাকার ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী পরিবেশবান্ধব চুলা ও হাজল স্থানীয় জাতের বীজ, ধান ও চাল হস্তশিল্প ও মাটির তৈজসপত্র হাতে আঁকা ছবিতে উপকূলের সংকট ও প্রাণবৈচিত্র্য উপকূলীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি আয়োজকরা জানান, এসব প্রদর্শনীর মাধ্যমে উপকূলের মানুষের বাস্তবমুখী ও স্বল্পব্যয়ে অভিযোজন পদ্ধতি তুলে ধরা হবে, যা জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
সাংস্কৃতিক আয়োজনে উপকূলের জীবনসংগ্রাম সারাদিনজুড়ে থাকবে জারি-সারি গান, স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন ও দেয়ালিকা প্রদর্শনী। এসব আয়োজনের মাধ্যমে উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম, চ্যালেঞ্জ, সংস্কৃতি ও আশার গল্প তুলে ধরা হবে। আয়োজকরা মনে করেন, সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার মাধ্যমে জলবায়ু সংকটের বাস্তবতা আরও প্রাণবন্তভাবে প্রকাশ পাবে।
নাগরিক সংলাপ: নীতিনির্ধারণে স্থানীয়দের কণ্ঠ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে আয়োজন করা হবে একটি নাগরিক সংলাপ। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। আলোচনায় উপকূলীয় অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করা হবে এবং স্থানীয়ভাবে নেতৃত্বাধীন অভিযোজন কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে।
একই সঙ্গে স্থানীয় জলবায়ু সংকট ও জনগোষ্ঠীর দাবি-দাওয়া তুলে ধরে পৃথক সংবাদ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যাশা আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এ মেলা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞানভিত্তিক সমাধানকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তারা স্থানীয় জনগণ, শিক্ষার্থী, যুবসমাজ, নারী সংগঠন, গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে মেলায় উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
উপকূলের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, উদ্ভাবনী শক্তি ও টিকে থাকার কৌশলকে স্বীকৃতি দেওয়ার এই উদ্যোগ শুধু একটি মেলা নয়—বরং এটি জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিকে জোরালো করার একটি সামাজিক আন্দোলনের অংশ বলে মনে করছেন।