
সত্য বলার সাহস, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা আর সমাজ বদলের স্বপ্ন—এই তিন শক্তিকে হৃদয়ে ধারণ করেই সাংবাদিকতার পথে হাঁটে একজন মানুষ। সেই পথচলার শুরু যদি হয় শিশুকালেই, তবে আগামীর সমাজ হয়ে ওঠে আরও আলোকিত। এমনই এক আশাব্যঞ্জক প্রয়াসের সাক্ষী হলো সাতক্ষীরা, যেখানে শিশুদের মধ্যে নৈতিক ও মানবিক সাংবাদিকতা গড়ে তুলতে আয়োজন করা হয় এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রশিক্ষণ কর্মশালা।
সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলার ২০ জন শিশু সাংবাদিককে নিয়ে ‘হ্যালো’র উদ্যোগে এবং ইউনিসেফের সহায়তায় দুই দিনব্যাপী শিশু সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিশুদের মধ্যে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও সমাজ পরিবর্তনের সাহসী মানসিকতা গড়ে তুলতেই এ আয়োজন করা হয়।
১৪ জানুয়ারি বুধবার সকালে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতার আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মশালার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, শিশুদের সত্য বলার সাহস শেখাতে পারলে তারাই আগামীর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলবে। এই প্রশিক্ষণ শিশুদের চিন্তা ও মননকে সমৃদ্ধ করবে।
কর্মশালার সূচনা হয় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে। স্বাগত বক্তব্য রাখেন হ্যালো’র তত্ত্বাবধায়ক ও সিনিয়র সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার, জেলা তথ্য কর্মকর্তা জাহারুল ইসলাম টুটুল এবং ন্যাশনাল চিল্ড্রেন টাস্কফোর্সের ডিস্ট্রিক্ট প্রেসিডেন্ট ও হ্যালো’র শিশু সাংবাদিক তীর্যক মণ্ডল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিশু প্রতিনিধি মায়িশা মৌনতা। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন আঞ্জুমান আরা খাতুন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নাজমুন নাহার বলেন, শিশুদের মধ্যে মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও নেতৃত্বের গুণ তৈরি করা গেলে তারাই আগামী দিনে সমাজের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে।
জেলা তথ্য কর্মকর্তা জাহারুল ইসলাম টুটুল বলেন, শিশু বয়স থেকেই সঠিক তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে উঠলে তারা কখনো গুজব বা অপসংবাদের অংশ হবে না। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।
কর্মশালার অন্যতম আকর্ষণ ছিল হ্যালো’র সাংবাদিকদের প্রতিকী গাড়ির ফটোস্ট্যান্ড, যেখানে শিশুদের উচ্ছ্বাস ও আনন্দ ছিল চোখে পড়ার মতো।
দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিডিনিউজের আন্তর্জাতিক বিভাগের সহ-সম্পাদক তনুশ্রী বিশ্বাস। তিনি শিশুদের সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, লেখার কৌশল ও নৈতিক সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক হাতে-কলমে শেখান।
দ্বিতীয় দিনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. শিমুল মণ্ডল। তিনি বলেন, এই শিশুরা শুধু সাংবাদিক নয়, তারা হবে বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী ও মানবিক মানুষ। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে এমন প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম।
সমাপনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সাংবাদিক আমিনা বিলকিস ময়না, বিনা’র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মিলন কবির, অধ্যাপক অভিজিৎ সাহা, এখন টিভির স্টাফ রিপোর্টার আহসানুর রহমান রাজীব, আড়পাঙাশিয়া পিএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেবাশীষ জোয়ার্দার, নাগরিক টিভির সাংবাদিক কৃষ্ণ ব্যানার্জী, দৈনিক খবরের কাগজের সাংবাদিক জাকির হোসেনসহ শিশু সাংবাদিক তাসিন মাহমুদ ও উজ্জয়নী জোয়ার্দার মুমু। সভাপতিত্ব করেন সুজানা জোয়ার্দার।
বিনা’র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মিলন কবির বলেন, শিশুদের মাঝে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও অনুসন্ধানী মনোভাব তৈরি হলে তারা সত্য অনুসন্ধানে আরও দৃঢ় হবে।
সাতক্ষীরা সদরের বিনেরপোতায় অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর আধুনিক ডিজিটাল ট্রেনিং হলরুমে আয়োজিত এই কর্মশালায় স্কুল ও মাদ্রাসার মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্তজ জনগোষ্ঠীর কন্যা ও ছেলে শিশুরা অংশ নেয়।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী শিশুরা মানুষের প্রতি মানবিক হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে। অভিভাবকরাও শিশুদের এই ইতিবাচক যাত্রায় পাশে থাকার অঙ্গীকার জানান। সত্য, সাহস আর স্বপ্নকে পাথেয় করে সাতক্ষীরার এই শিশুরা যেন একদিন সমাজের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে—সেই প্রত্যাশাই রেখে গেল এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।