
যমদূতের ফোনকল
রাত সাড়ে বারোটা বাজে, পুরোনো আমলের ফোনটা হঠাৎ বেজে ওঠে,
আমি ক্লান্ত চোখে তাকাই, মনে হয় স্বপ্ন, নাকি বিভ্রম?
ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কাঁপা হাতে রিসিভ করে জিজ্ঞাসা করি, -“কে?”
ওপাশ থেকে ভেসে ওঠে অচেনা এক কন্ঠ— “যমদুত বলছি”ওপাশ থেকে শোনা যায় ভারী শ্বাস ও দীর্ঘ নীরবতা,
যেন মহাকালের ওজন বয়ে বেড়াচ্ছে।
তারপর একটা ঠান্ডা গলা, গভীর অথচ ক্লান্ত—— “তুমি কি চলে যেতে চাও?”
আমি জানি না কী বলবো, হাসবো না কাঁদবো,
নাকি সিগারেটের ধোঁয়ার ভেতর নিজেকে লুকিয়ে ফেলবো।
এই চাকরি, এই সংসার, আত্মীয়দের মুখোশ…
সব মিলিয়ে জীবনটা এখন এক জং ধরা গিয়ারবক্স,
চলতে চায় না, আটকে আছে কোথাও,
অর্থহীন নিয়মের জালে গলে যাওয়া লোহা।— “কেন? সময় হয়ে গেছে?”
ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস,
মনে হলো, সে-ও ক্লান্ত আমার মতো।
যমদূতেরা কি কখনো বিরক্ত হয়?
মানুষের এই অন্তহীন অভিযোগ শুনতে শুনতে?— “তুমি তো কবি, বাউন্ডুলে, পথের মানুষ,
তবু কেন এখনই যেতে চাও?”আমি হেসে ফেলি, বিষন্ন এক শব্দ ভেসে যায় শূন্যে—
— “কারণ আমি ক্লান্ত।
চাকরি করি, কিন্তু যন্ত্রের মত।
পরিবারে আছি, কিন্তু অস্তিত্বহীন।
রক্তের সম্পর্কগুলো কেবল হিসেবের খাতা,
ভালোবাসা বলতে কেবল রুটিনের শূন্যতা।
তুমি কি জানো, আমি কতবার নিঃশব্দে মরে গেছি?”ওপাশে নিস্তব্ধতা, যেন মহাশূন্যের গভীর গহ্বর।
তারপর সে বলে—— “তুমি কি জানো, যাদের মনে মৃত্যু বয়ে বেড়ায়,
তারা সহজে মরতে পারে না?”আমি চুপ করে থাকি।
এই অর্থহীন পৃথিবীর এক কোণে দাঁড়িয়ে,
একজন যমদূতের সাথে কথা বলছি,
তবু উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।— “তাহলে তুমি কি আমাকে নিতে আসবে না?”
— “একদিন আসব। কিন্তু আজ নয়।
আজ তুমি বেঁচে থাকো,
তোমার কবিতাগুলোর মতো,
যে জীবন বুঝেও বোঝে না,
যে মৃত্যু ডাকলেও সাড়া দেয় না…”কল কেটে যায় আচমকা যেভাবে এসেছিল অনেকেই,
আমি তাকিয়ে থাকি ফোনটা হাতে নিয়ে।
বইয়ের মলাট উল্টে দেখি জানালার বাইরে শূন্য আকাশ।
মনে হয়, আজ রাতে আর ঘুম আসবে না!