
প্রকৃতিতে এখন হাড়কাপানো শীত। সাতক্ষীরার আকাশ জুড়ে ঘন কুয়াশার চাদর যেন এক নীরব শোকের বার্তা বয়ে আনছে। এমন এক বিষণ্ন বিকেলে সাতক্ষীরা প্রবীণ কল্যাণ সংস্থার কার্যালয় প্রাঙ্গণ সিক্ত হলো দুই গুণী মানুষের স্মৃতিচারণায়। সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. দিলারা বেগম এবং সংগঠনের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ভূধর চন্দ্র সরকারের স্মরণে রবিবার (১১ জানুয়ারি ‘২৬) এক শোকসভা ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
বিকেল চারটায় যখন সূর্যের তেজ ম্লান হয়ে আসছিল, তখন প্রবীণদের এই মিলনমেলায় স্মৃতির জানালা খুলে বসেছিলেন সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। সংগঠনের সভাপতি ডা. সুশান্ত ঘোষের সভাপতিত্বে এবং জেলা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি শহীদুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় এক আবেগঘন পুনর্মিলনীতে।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ফজলুর রহমান বলেন, “ড. দিলারা বেগম ও অধ্যাপক ভূধর চন্দ্র সরকার কেবল শিক্ষক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন এই সমাজের আলোকবর্তিকা। শীতের ঝরাপাতার মতো তা্ঁরা আমাদের ছেড়ে গেলেও তাঁদের আদর্শের শিকড় এই জনপদে আজীবন প্রোথিত থাকবে।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ, কাজী আবু হেলাল, প্রফেসর মনিরুজ্জামান, কিশোরী মোহন সরকার, প্রকৌশলী আবেদুর রহমান, অধ্যক্ষ লিয়াকত পারভেজ এবং অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী।
বক্তাদের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছিল প্রয়াত এই দুই শিক্ষাবিদের শিক্ষা ও সমাজসেবার নানা গৌরবময় অধ্যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দীন ও ডা. জ্যোতির্ময় সরকারসহ অন্যান্য বক্তারাও তঁাদের অকাল প্রয়াণে গভীর শূন্যতা ও শোক প্রকাশ করেন।
বক্তারা বলেন, ড. দিলারা বেগমের দৃঢ়তা এবং ভূধর চন্দ্র সরকারের কর্মনিষ্ঠা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। কুয়াশা যেমন একসময় কেটে যায়, তেমনি মানুষের জীবনও নশ্বর; কিন্তু তঁাদের কর্মের সৌরভ কোনো ঋতুর বঁাধনে ধরা পড়ে না।
আলোচনা সভা শেষে প্রয়াতদের বিদেহী আত্মার চিরশান্তি ও মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে শোকসভা শেষ হলেও উপস্থিত সকলের মনে থেকে যায় এক অপূরণীয় বিচ্ছেদের হাহাকার।
আর্তমানবতার সেবায় সাতক্ষীরা প্রবীণ কল্যাণ সংস্থা। প্রবীণদের সুরক্ষা ও বিনোদনে সংগঠনটি মূলত সমাজের প্রবীণ নাগরিকদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে এবং তাঁদের অধিকার আদায়ে কাজ করে। এখানে জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা একত্রিত হয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন, যা তাঁদের মানসিক প্রশান্তি প্রদান করে। স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য সংস্থাটি নিয়মিত বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা করে। বিশেষ করে প্রবীণদের জন্য ডায়াবেটিস পরীক্ষা, রক্তচাপ মাপা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংগঠনটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। শীতকালে অসহায় মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ, দুর্যোগকালীন ত্রাণ সহায়তা এবং আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে সংস্থাটি মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জেলার প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে তাঁদের স্বেচ্ছাসেবীরা সব সময় তৎপর থাকেন।
সংগঠনটি ড. দিলারা বেগম বা অধ্যাপক ভূধর চন্দ্র সরকারের মতো গুণী ব্যক্তিদের স্মরণে নিয়মিত সভার আয়োজন করে। এর মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মকে আলোকিত মানুষদের কর্মজীবনের সাথে পরিচিত করানো হয়, যা জেলার সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে। সংগঠনটিতে জেলা প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা, প্রবীণ চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও মুক্তিযোদ্ধারা যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সুচিন্তিত পরামর্শ সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।