
সবচেয়ে প্রিয় খেলা ফুটবল। মাঠে বল পায়ে ছুটে চলা, দেশের জন্য গোল করা এটাই তার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন টিকে আছে এক সুতোয়। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিশখালী ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় প্রতিমা মুন্ডা আজ দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
একদিকে মাঠে দেশের গৌরব বয়ে আনা এই কিশোরীর প্রতিভা, অন্যদিকে মাটির ঘরহীন জীবন আর টানাপোড়েনের সংসার। প্রশ্ন এখন একটাই অর্থের অভাবে কি প্রতিমার প্রতিভা থেমে যাবে? সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) পক্ষ থেকে প্রতিমা মুন্ডাাকে (ফু-৯৩৩) তিন বছরের বকেয়া খরচ বাবদ ৪৬ হাজার ৮৪০ টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। বিকেএসপি’র অধ্যক্ষ লেঃ কর্ণেল মোঃ ইমরান হাসান, পিএসসি স্বাক্ষরিত একটি নোটিশে উক্ত বেতন পরিশোধ করার জন্য বলা হয়। প্রতিমা মন্ডল বিকেএসপি’র খরচ পরিশোধের জন্য টাকা যোগাড়ে ব্যর্থ হয়ে তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট সাহায্যের আবেদন করেন।
জানা গেছে, প্রতিমার জন্ম খুলনার কয়রায়। ২০০৯ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ তাদের বসতভিটা কেড়ে নেয়। জীবনের নিরাপত্তার খোঁজে পরিবারটি চলে আসে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার দূর্গাপুর গ্রামে। বাবা শ্রীকান্ত মুন্ডা ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে বছরজুড়ে কাজ করেন, আর মা সুনিতা মুন্ডা অন্যের মৎস্যঘেরে শ্রম দিয়ে সংসার চালান। তিনবেলা খাবারের নিশ্চয়তা নেই; তবু মেয়ের পড়াশোনা ও খেলাধুলা বন্ধ হতে দেননি।
তালা উপজেলার গাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই প্রতিমা ফুটবলে অনন্য ছিল। স্কুল, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে একের পর এক জয় এনে দেয় সে। তখনই তার প্রতিভা চোখে পড়ে স্থানীয় প্রশিক্ষক আরিফুল হাসান প্রিন্সের। প্রিন্স তাকে নিজের সন্তানের মতো করে গড়ে তোলেন খেলাধুলা ও শৃঙ্খলার পাঠ দেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জেলা পর্যায়ে সুনাম অর্জনের পর প্রতিমা জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পান। স্টেডিয়ামে নিয়মিত অনুশীলন, প্রভাতে মাঠে দৌড় আর রাতে আলো-নেভা বাতির পাশে পড়াশোনা।
তালা উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ এনামুল ইসলাম জানান, প্রতিমা মন্ডল ২০২২ সালে অনূর্ধ্ব-১৫ বাংলাদেশ জাতীয় দলে, ২০২৩ সালে ভিয়েতনামে অনূর্ধ্ব-১৭ দলে, ২০২৪ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সুব্রত কাপে বিকেএসপি’র হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন। এছাড়া পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে দেশের জন্য গৌরব অর্জন করেছেন। জাতীয় দলে তিনি খেলেন ডিফেন্ডার হিসেবে।
তার সতীর্থরা বলেন, প্রতিমা মাঠে যেমন দৃঢ়, তেমনি বাইরে বিনয়ী ও পরিশ্রমী। বর্তমানে প্রতিমা একটি কলেজে এইচএসসি পড়ছেন এবং বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। কিন্তু বিকেএসপিতে তিন বছরের খরচ বাবদ ৪৬ হাজার ৮৪০ টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। এত টাকা তাদের মতো শ্রমজীবী পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব।
প্রতিমার মা সুনিতা মুন্ডা বলেন, “মেয়ের খরচ জোগাতে অন্যের ঘেরে কাজ করি। ভগবান যেন মেয়েকে আশীর্বাদ দেন, দেশ যেন তার গর্ব হয় এই প্রার্থনাই করি।”
তিনি আরও জানান, একটি স্থানীয় সংস্থা সহানুভূতির বশে তাদের জন্য একটি ছোট্ট ঘর তৈরি করে দিয়েছে, কিন্তু ঘরে যাওয়ার রাস্তা পর্যন্ত ঠিকমতো নেই। সরকারি সাহায্য মেলেনি বহুদিন।
প্রতিবেশী বিবেকানন্দ, সুনীল রায়, শেফালী মুন্ডা, তুলসী মুন্ডারা বলেন, “প্রতিমা আমাদের গ্রামের গর্ব। যদি সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা একটু সহায়তা করেন, এই মেয়েটি একদিন দেশকে বড় কিছু উপহার দিতে পারবে।”
এদিকে দুর্গাপূজার ছুটি শেষে প্রতিমা বিকেএসপিতে ফিরে গেছেন। যাওয়ার আগে তিনি বলেন, “আমি সাংবাদিকদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আপনাদের কারণেই সমাজ আমার পাশে দাঁড়াচ্ছে। আমি একদিন দেশের গৌরব হবো-এই স্বপ্ন নিয়েই আবার মাঠে ফিরেছি।”
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপা রানী সরকার বলেন, “এই মুহূর্তে সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। তবে সুযোগ এলে প্রতিমার জন্য বসতঘর ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।”