
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। রূপসা-কপোতাক্ষ-ইছামতীর হাওয়ায় ভেসে আসা নদী আর ম্যানগ্রোভের যে অনন্য সুর, সেই সুরকে আপন প্রাণের মধ্যে ধারণ করে যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সঙ্গীতের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তিনি আবু আফ্ফান রোজবাবু।
১৯৬৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা পৌরসভার মুনজিৎপুরের ১৩৩৮ নম্বর বাসায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন রোজবাবু। তাঁর পিতা মরহুম শেখ হামিদুর রহমান এবং মাতা ছকিনা রহমান (ম্যাজিস্ট্রেট রেকর্ডে মিসেস ছকিনা বেগম)। ১ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের তৃতীয় সন্তান।
শৈশব থেকেই রূপসী সুরের ভুবন তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করত। তবে সুরের পিছে ছুটলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে তিনি অবহেলা করেননি। ১৯৮৪ সালে সফলতার সঙ্গে বি.এ (স্নাতক) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তবে ডিগ্রি অর্জনের চেয়েও তাঁর মনপ্রাণ মজে ছিল সপ্তসুরের মূর্ছনায়।
সঙ্গীতের প্রতি অদম্য অনুরাগের কারণে ছাত্রজীবন থেকেই সুরের তালিম নেওয়া শুরু করেন রোজবাবু। সঙ্গীতের ব্যাকরণ ও শাস্ত্রীয় দক্ষতার গভীরে প্রবেশের জন্য তিনি প্রখ্যাত ওস্তাদদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।
তিনি প্রথম তালিম নেন ওস্তাদ আমজাদ হোসেনের কাছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ওস্তাদ অপূর্ব রায় এবং রুবিনা আহমেদের কাছে সুরের ভিত্তি শক্ত করেন।
১৯৮৯ সালে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী রাসবিহারী এভিনিউয়ের ‘ইন্ডিয়ান মিউজিক্যাল একাডেমি’-তে বিশিষ্ট সুরসাধক ওস্তাদ কল্যাণ সেন বরাটের কাছে সাধারণ ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে নিবিড় তালিম গ্রহণ করেন।
১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল— দীর্ঘ সাত বছর তিনি ঢাকার বিখ্যাত সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক প্রয়াত ওস্তাদ প্রণব ঘোষের অধীনে আধুনিক ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ওপর কঠোর সাধনা করেন।
২০০২ সালে সাতক্ষীরা জেলা শিল্পকলা একাডেমির বিশেষ আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ঢাকার ওস্তাদ রুবিনা আহমেদ ও সাজাহান কবীরের কাছে পুনরায় উচ্চতর সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নেন।
পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী হলেও তাঁর মূল পরিচয় ও জীবনের একমাত্র ব্রত বা সাধনা হয়ে ওঠে সংস্কৃতিচর্চা।
রোজবাবুর সঙ্গীত জীবনের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয় ১৯৮২ সালে খুলনা বেতারে আধুনিক গান পরিবেশনের মাধ্যমে। এরপর ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্রের নিয়মিত তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ বেতারের ‘স্পেশাল গ্রেড’-এর বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী এবং মিউজিক প্রডিউসার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
শুধু গায়কিতেই থেমে থাকেননি তিনি। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘আপনাদের চিঠি পেলাম’ সফলতার সঙ্গে সঞ্চালনা ও পরিচালনা করেন।
অভিনয় জগতেও নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন এই গুণী শিল্পী। ১৯৯৯ সালে এটিএন বাংলায় প্রচারিত জনপ্রিয় প্যাকেজ নাটক ‘বিনিময়ে তুমি’-তে নায়ক চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসিত হন। উক্ত নাটকে তাঁর বিপরীতে নায়িকা হিসেবে ছিলেন তানিয়া রহমান। এ ছাড়া নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি; ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জোৎস্না রাতে’ ছায়াছবির চলচ্চিত্রে যৌথ কণ্ঠে গান পরিবেশন করেন তিনি।
শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থান করে নিতে তিনি উপহার দিয়েছেন একের পর এক মন ছুঁয়ে যাওয়া গান। এ পর্যন্ত একক ও যৌথ মিলিয়ে তাঁর ২১টি আধুনিক গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অডিও ক্যাসেট ও অ্যালবামগুলো হলো—নীল নয়না, অনেক রাত, দুঃখ, দুঃখ পেওনা বন্ধু।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তালিকাভুক্ত এই সঙ্গীতশিল্পী দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আন্তর্জাতিক যুব ১৯৮৫ বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সম্মেলনসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে গান গেয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। বর্তমানেও তিনি দেশী-বিদেশী বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে সরাসরি লাইভ সঙ্গীতানুষ্ঠানে পারফর্ম করে সঙ্গীতপ্রেমীদের মন জয় করে চলেছেন।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্কৃতি অঙ্গনে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অগণিত সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন আবু আফ্ফান রোজবাবু। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন: আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গুণীজন সংবর্ধনা (২০২৬): সম্প্রতি তিনি এই ভূষণে ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক (২০১৩): সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য অর্জিত বিটিভি ও শিল্পকলার অনন্য সম্মান। জাতীয় গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতা (২০১২): সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে গণসঙ্গীতে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের গৌরব লাভ করেন। মাদার তেরেসা মঞ্চ পদক (১৯৯৯): সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ‘মাদার তেরেসা ট্রাস্ট ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক সম্মানিত। সত্যজিৎ রায় সম্মাননা (১৯৯৭): কলকাতার বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’-র উদ্যোগে আয়োজিত বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করেন এবং পুরস্কার লাভ করেন। সাতক্ষীরা থিয়েটার-৯৩ সম্মাননা: স্থানীয় নাট্যচর্চায় অনন্য অবদানের জন্য এই সম্মাননা অর্জন।
শুধু নিজে গান গেয়ে বা অভিনয় করেই ক্ষান্ত হননি, নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন অবিরাম। তিনি সাতক্ষীরার খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘লিনেট ফাইন আর্টস একাডেমি’-র অধ্যক্ষ ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি পরিবেশ ও সামাজিক আন্দোলন জোরদারে তিনি সামাজিক সংগঠন ‘গ্রীন জোট/কোয়ালিশন’-এর সভাপতির দায়িত্ব সফলভাবে সামলাচ্ছেন।
বিটিভির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন ও 'উচ্চ' শ্রেণিতে পদোন্নতি: সঙ্গীত জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশ টেলিভিশন তাঁর এই দীর্ঘ সাধনাকে আরও একবার আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করল।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের গ্রেডেশন/পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালার আওতায় বোর্ডের সুপারিশক্রমে তাঁকে আধুনিক গানের সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে "ক" শ্রেণি হতে মর্যাদাপূর্ণ "উচ্চ" শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে।
বিটিভির কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজার (সংগীত) ও গ্রেডেশন বোর্ডের সদস্য-সচিব মোহাম্মদ মনিরুল হোসেন স্বাক্ষরিত সরকারি দাপ্তরিক পত্রে (স্মারক নং: বিটিভি/সংগীত-১২ (অংশ-০৩)/অডিশন-গ্রেডেশন/২০২৩/
সাতক্ষীরার এই কৃতি সন্তান নিজের সাধনা, ত্যাগ এবং সঙ্গীতের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসার মাধ্যমে আজ এক বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছেন। 'উচ্চ' শ্রেণিতে বিটিভির এই নতুন পদোন্নতি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়, এটি সাতক্ষীরা অঞ্চলের সমগ্র সাংস্কৃতিক জগতের জন্য এক বিশাল গৌরব ও আনন্দের বিষয়। সুরের প্রতি আবু আফ্ফান রোজবাবুর এই আজন্ম ভালোবাসা ও আত্মনিবেদন আগামী প্রজন্মের সঙ্গীতসাধকদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শেখ আমিনুর হোসেন
দেশ টাইমস
www.deshtimes24.news.com
Copyright © 2026 DESHTIMES 24. All rights reserved.