
সাতক্ষীরা শহরের ঐতিহ্যবাহী মায়ের বাড়ি মন্দিরে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ‘২৬) সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে।
আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বর্ণাঢ্য রথযাত্রা, যা শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে।
উৎসবের এই মহতী আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ এবং উদ্বোধক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ সুপার আবু সালেহ মোঃ আশরাফুল আলম।
দিনব্যাপী এই আয়োজনে হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে, যারা পরম ভক্তি ও উৎসাহের সঙ্গে রথ টানার মাধ্যমে জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। প্রশাসন ও মন্দির কমিটির সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় উৎসবটি এক অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় রূপ নেয়, যা স্থানীয় জনজীবনে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
উৎসবের মূল আয়োজনে অংশ নেওয়া সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্ত ও আয়োজক কমিটির সদস্যরা এই বিশেষ দিনটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভক্তদের মতে, রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও বিশ্বশান্তির প্রার্থনার একটি বড় মাধ্যম। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উৎসব চলাকালীন সময়ে মন্দিরের আশপাশের এলাকায় জনসমাগম বৃদ্ধি পেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছিল। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ভক্তরা নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষ করে, শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা উৎসবের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল, যা দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের গভীর শ্রদ্ধাবোধকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যে গৌরবময় ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে, তা অক্ষুণ্ণ রাখা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।
অন্যদিকে, পুলিশ সুপার আবু সালেহ মোঃ আশরাফুল আলম জানান, উৎসবটি নির্বিঘ্ন করতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। কেবল রথযাত্রা নয়, বরং পুরো উৎসব চলাকালীন গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল যাতে কোনো মহল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ না পায়। পুলিশের এই সতর্ক অবস্থান এবং জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা ধর্মীয় উৎসবগুলোকে আরও নিরাপদ করে তুলেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ।
রথযাত্রা মহোৎসব-২০২৬-এর এই সফল আয়োজন সাতক্ষীরা জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা আরও সুসংহত করল। প্রশাসনের এই ধরনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তাদের প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতে অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব পালনেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বজায় রাখবে। এই ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবের সফল সমাপন কেবল স্থানীয় সংস্কৃতিকেই সমৃদ্ধ করছে না, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মহোৎসব সাতক্ষীরার সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আগামীর দিনগুলোতেও ভ্রাতৃত্ববোধের এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে অনুপ্রাণিত করবে।