ডিজিটাল রূপান্তরের এ সময়ে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বা টিএফজিবিভি একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও মানবাধিকারগত উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষত নারী ও কন্যাশিশুরা এর ঝুঁকিতে বেশি থাকায় সচেতনতা, প্রতিরোধ ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাতক্ষীরায় বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এবং অগ্রগতি সংস্থা যৌথভাবে একটি মাল্টিস্টেকহোল্ডার সংলাপের আয়োজন করে সোমবার (২০ এপ্রিল ২০২৬)। সংলাপে ডিজিটাল উন্নয়ন, প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধরন, এর সামাজিক প্রভাব, প্রতিরোধ ও প্রশমন কৌশল এবং করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. শরীফ আসিফ রহমান। সংলাপটি “Strengthening Resilience against Technology-Facilitated Gender-Based Violence and Promoting Digital Development” স্ট্রেনথেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি-ফেসিলিটেটেড জেন্ডার-বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) এন্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়হয়। প্রকল্পটি নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ এবং অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
সংলাপের শুরুতে অগ্রগতি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সবুর স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা অনেক সময় পরিবার ও সমাজে আড়াল করা হয়, বিশেষ করে নারী ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে। এই নীরবতা ভাঙতে এবং বিষয়টিকে প্রকাশ্যে আলোচনায় আনতে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।
বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী এ এইচ এম বজলুর রহমান টিএফজিবিভির ধারণা, ধরন, ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা দেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল উন্নয়নকে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে চারজন মনোনীত আলোচক বক্তব্য দেন এবং পরে অংশগ্রহণকারীরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। তাঁরা টিএফজিবিভি প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহি জোরদার করা এবং নতুন অংশীজনদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, কেবল নেটওয়ার্ক প্রতিনিধি এবং মোবাইল আর্থিক সেবার স্থানীয় এজেন্টদেরও এ বিষয়ে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ইসমত আরা বলেন, প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অসচেতন ব্যবহার নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত সহিংসতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. শরীফ আসিফ রহমান বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধরনও বদলেছে। এই বাস্তবতায় সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান, সঠিক তথ্যপ্রবাহ এবং পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধের চর্চা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, নারী ও পুরুষের সমঅধিকার, আত্মমর্যাদা ও নিরাপদ সহাবস্থানের শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই পরিবারে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়, তবে প্রযুক্তির সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতেই হবে। ভুলতথ্য ও অপতথ্য রোধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশ পুলিশের Police Cyber Support for Women সেবার কথাও উল্লেখ করেন। নারী ও কন্যাশিশুরা সাইবার সহিংসতার ঘটনায় সহায়তার জন্য 01320000888 নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা (cybersupport.women@police.gov.bd) ঠিকানায় ই-মেইল করতে পারেন।