
সুন্দরবন উপকূলের উন্নয়নে পৃথক বোর্ড ও মন্ত্রণালয় গঠনসহ সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির ২১ দফা বাস্তবায়নে সংবাদ সম্মেলন করেছে সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটি। শনিবার (১৮ এপ্রিল '২৬) সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক এডভোকেট শেখ আজাদ হোসেন বেলাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সাতক্ষীরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি জেলা। এখানে বছরে ৫ লক্ষাধিক মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়। ২৮ হাজার মেট্রিক টন বিদেশে রপ্তানীযোগ্য চিংড়িসহ গড়ে ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন হয়। প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন শীতকালীন শাক সবজি, ৭৫ হাজার মেট্রিক টন আম, ১৫ হাজার মেট্রিক টন কুল, প্রায় ১০০ মেট্রিক টন মধুসহ বিপুল পরিমান অন্যান্য রবিশষ্য উৎপাদন হয়। এছাড়া ভোমরা স্থল বন্দর হতে বছরে গড়ে ১ হাজার কোটি টাকার রাজম্বসহ সুন্দরবন ও মৎস্য সম্পদ থেকে বিপুল পরিমান রাজস্ব আয় হয়।
কিন্তু এই জেলায় ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীর ভেড়িবাধ ভাঙন, জলাবদ্ধতা, লবনাক্ততাসহ ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। অতিরিক্ত লবনাক্ততার কারনে এখানকার উন্নয়ন টেকসই হয় না। জলবায়ু পরিবর্তনে পরিবেশগত ঝুকি, সুপেয় পানির সংকট, কৃষি জমির পরিমান ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। দারিদ্রতার হার দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে অনেক বেশী। শিক্ষার হারও কমে যাচ্ছে। দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৩ শতাংশ হলেও সাতক্ষীরা জেলায় এই হার কমে ০.৯০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এর প্রধান কারন ব্যাপক সংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধ্যানে স্থায়ী-অস্থায়ীভাবে অন্যত্রে চলে যেতে বাধ্য হওয়া। এই মানুষের মিছিলের একটি অংশ সাতক্ষীরা শহরে চলে আসছে। ২০২২ সালের জনশুমারীর তথ্যানুযায়ী সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার উল্লেখ করা হলেও বর্তমানে তা ২ লাখ অতিক্রম করেছে।
আজাদ হোসেন বেলাল আরো বলেন, গত ৫৫ বছরে সারাদেশের যে উন্নয়ন হয়েছে, সেই ধারা থেকে সাতক্ষীরা অনেক বেশি পিছিয়ে। তাছাড়া এখানকার ভূ-প্রকৃতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলাবদ্ধতা ও লবনাক্ততার কারনে কোন উন্নয়নই টেকসই হয় না। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত সারাদেশের একই ডিজাইনের রাস্তাঘাট-ব্রীজ-কালভার্ট, সরকারি ভবন, নদীর ভেড়িবাধগুলো এখানে অতিদ্রুত সময়ে নষ্ট হয়ে যায়।
জেলা নাগরিক কমিটি দাবি তুলে বক্তরা বলেন, আমরা জেলা নাগরিক কমিটি সুন্দরবন উপকূলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে “সুন্দরবন উপকূলীয় বোর্ড ও মন্ত্রণালয় গঠন” এবং আসন্ন বাজাটে এই অঞ্চলের উন্নয়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দের দাবী জানাচ্ছি। একই সাথে সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রেল লাইন, আয়তন ও জনসংখ্যা বিবেচনায় নতুন একটি উপজেলা প্রতিষ্টা, ভোমরা স্থলবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে এবং বসন্তপুর নৌবন্দর চালু করা, ক্রীড়া কমপ্লেক্স, পর্যটন এলাকা ঘোষণা, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু, বিকল্প বাইপাস, শ্রমঘন বিশেষ শিল্পাঞ্চল, লবনাক্ত, আর্সেনিক ও আয়রণমুক্ত নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা, বাস ও ট্রাক টার্মিনাল স্থাপন, উপজেলা ভিত্তিক স্টেডিয়াম, বিআরটিসির বাস সংখ্যা বাড়ানো, চলাচলে অযোগ্য সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার, সাতক্ষীরা জেলা ও পৌরসভার উন্নয়নে মাষ্টার প্লান, আইটি সিটি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নদী ভাঙ্গন ও জলাবন্ধতা সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা, জলবায়ু উদ্বাস্তুু আবাসনকেন্দ্র, জেলার সকল নদী-খালের জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনাসহ ২১ দফা দাবী জানাচ্ছি।
পরে মতবিনিময় সভায় জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলি নুর খান বাবুলের পরিচালনায় এসময় উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির
সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, শিক্ষাবিদ আব্দুল হামিদ, সনাকের সাবেক সভাপতি হেনরি সরদার, মানবাধিকার কর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত, সিপিবির আবুল হোসেন, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শ্বপন কুমার শীল, শ্রমিক নেতা শেখ হারুন অর রশিদ, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক কল্যাণ ব্যানার্জি।