
মুদ্রিত মিথ্যার অরণ্যে আমি
- কবি শাহাবুদ্দীন
আজ সকালের কাগজ খুলে দেখি—
আমার নামে এক অচেনা মানুষ
হেঁটে বেড়াচ্ছে শহরের ভিড়ে।
তার চোখে আমার দৃষ্টি নেই,
তার কণ্ঠে আমার কোনো শব্দ নেই,
তবু সে-ই আমি হয়ে উঠেছে
কালো অক্ষরের ভিতর।
কাগজের পাতায় কালি শুকোয়—
যেন শীতের ভোরে জমে থাকা শিশির,
কিন্তু সেই কালির ভেতর
কেউ ঢেলে দিয়েছে এক অদৃশ্য অন্ধকার,
যেখানে সত্য ঢুকতে পারে না,
শুধু মিথ্যার দীর্ঘ ছায়া
বাড়তে থাকে নিঃশব্দে।
কে লিখলো এই গল্প?
কোন অচেনা হাত
আমার নামের পাশে বসিয়ে দিলো
একটি অজানা অপরাধের ছায়া?
আমি তো সেই পথ হেঁটে আসিনি,
আমি তো সেই শব্দ উচ্চারণ করিনি—
তবু আজ শহর জানে আমাকে
একটি ভুল পরিচয়ে।
রাস্তার ধারে পত্রিকা উড়ছিলো—
বাতাসে ভেসে যাওয়া পাতা,
যেন আমারই ছিন্ন পরিচয়
এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ছে।
লোকেরা পড়ছে, মাথা নাড়ছে,
কেউ বিশ্বাস করছে,
কেউ চুপচাপ রেখে দিচ্ছে—
কিন্তু কেউ আমার দিকে ফিরে তাকায় না।
আমি তখন একা—
নিজের ভেতর বসে লিখতে চাই
একটি প্রতিবাদের বাক্য,
কিন্তু শব্দগুলো এসে থেমে যায়
কোনো অদৃশ্য দেয়ালে।
আমার কণ্ঠ যেন আটকে গেছে
কালির স্তরের নিচে।
রাতে—
ঘরের ভেতর অন্ধকার নামে ধীরে,
আমি ভাবি—
একটি মিথ্যা কি এতটাই শক্তিশালী
যে সত্যকে ঢেকে দেয়?
নাকি সত্যই এত নিঃশব্দ
যে সে নিজেকে প্রকাশ করতে জানে না?
আমি জানি—
এই কাগজ একদিন পুরোনো হবে,
এই মুদ্রিত অক্ষর মুছে যাবে ধীরে,
তবু আজকের এই দাগ
আমার ভেতরে থেকে যাবে,
একটি অরণ্যের মতো,
যেখানে পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আমি হাঁটছি—
নিজের নামকে ফিরে পাওয়ার জন্য,
শহরের শব্দের ভিড় পেরিয়ে,
একটি নির্জন সত্যের দিকে।
সেখানে হয়তো কোনো কাগজ নেই,
কোনো মুদ্রিত মিথ্যা নেই—
শুধু আমার নিঃশব্দ শ্বাস,
আর আমার নিজের পরিচয়।
তবু আজ—
এই সংবাদপত্রের ভাঁজে ভাঁজে
আমি খুঁজে ফিরি নিজেকে,
যেন হারিয়ে যাওয়া এক ছায়া,
যে জানে—
তার সত্য কোথাও আছে,
কিন্তু সে পৌঁছাতে পারে না
এই কোলাহলময় মুদ্রিত অরণ্যের ভেতর।
আমি প্রতিবাদ করি—
কিন্তু তা শব্দে নয়,
কাগজে নয়—
আমি প্রতিবাদ করি
আমার নীরবতায়,
আমার বেঁচে থাকায়,
আমার সত্যে অটল থাকার ভিতরে।
একদিন হয়তো—
এই শহর ভুলে যাবে এই কাগজ,
এই মিথ্যা, এই অক্ষর,
কিন্তু আমি মনে রাখবো—
কিভাবে একদিন
আমার নামের পাশে
অন্য এক জীবন লেখা হয়েছিলো।